২০২৬–২৭ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তী বাজেটে একাধিক চমক : ৫ MSME পার্ক তৈরি, জেলার শহরের উন্নতি-সহ ২১ দফা ঘোষণা!
নিজস্ব সংবাদদাতা : ৫ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তী বাজেটে একাধিক চমক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের। সবমিলিয়ে এবার বাজেটে (ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট) মোট ২১টি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।৫ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এই বাজেট পেশ করেন।এই বাজেটে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষকে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে রাজ্য সরকার—যুবসমাজ, মহিলা, কৃষক, ক্ষেতমজুর, আশা কর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী—সবার জন্যই রয়েছে নতুন ঘোষণা ও বরাদ্দ বৃদ্ধি।
বাজেট ভাষণে কী কী বললেন অর্থমন্ত্রী?
১) রাজ্যে মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষকে প্রতি বছর গঙ্গার ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য ভাঙন রোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যাটির একটি চিরস্থায়ী সমাধান আশু প্রয়োজন। এজন্য, সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য ও পরামর্শ নিয়ে একটি সার্বিক পরিকল্পনা রূপায়ণ করতে চলেছে।
২) রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে ৬টি 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইকনমিক করিডর' তৈরি করার কাজ হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের পরিকাঠামো গঠনে যৌথ অংশগ্রহণ করার জন্য নামী আর্থিক সংস্থা প্রস্তাব দিয়েছে। এই পরিকাঠামো দ্রুত গঠনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প সংস্থাগুলি বিনিয়োগ করবে এবং রাজ্যে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
৩) কর্মসংস্থানের প্রয়াসে জলপাইগুড়ি জেলায় দুটি এবং বীরভূম, বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি করে মোট পাঁচটি নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পার্ক (MSME) স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৪) এছাড়াও রাজ্যে সরকারি জমিতে যৌথ উদ্যোগে একটি উচ্চমানের 'গ্লোবাল ট্রেড সেন্টার' গড়ে তোলা হবে।
৫) রাজ্যে খেলাধুলোর উন্নতির জন্য হাওড়ার ডুমুরজলাতে ইতিমধ্যে একটি 'স্পোর্টস সিটি' তৈরি করা হচ্ছে। এবার কলকাতার উপকণ্ঠে বারুইপুরে ইতিমধ্যে টেলি অ্যাকাডেমি গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে এই অ্যাকাডেমিকে কেন্দ্র করে একটি 'সংস্কৃতি শহর' বা 'কালচারাল সিটি' গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
৬) রাজ্যের অনেকগুলি শহরকে আধুনিক করে গড়ে তোলার জন্য সরকার একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এর ফলে শহরগুলি ব্যবসা, পরিবেশ ও কর্মসংস্থান-বান্ধব হবে এবং সেখানে আধুনিক জীবনের সুযোগসুবিধা থাকবে, যেখানে ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (পরিকাঠামো)বড় ভূমিকা থাকবে। বর্তমানে হাওড়া, ডায়মন্ড হারবার, বর্ধমান, দুর্গাপুর, বোলপুর, কৃষ্ণনগর, বারাসত, রায়গঞ্জ, শিলিগুড়ি, বহরমপুর, মালদা, কল্যাণী, শ্রীরামপুর, অণ্ডাল, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দিঘা, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, নিউটাউনের এনকেডিএ এলাকা, গঙ্গারামপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিং শহরের জন্য এই আধুনিকীকরণ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধা না ঘটিয়ে কীভাবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব, তা খতিয়ে দেখতে সরকার একটি কমিটি গঠন করবে।
৭) রাজ্যের হিমঘরগুলিতে বর্তমানে ৫.৯৫ মিলিয়ন টন কোল্ড স্টোরেজ ক্ষমতা আছে এবং পশ্চিমবঙ্গ এ বিষয়ে দেশের মধ্যে প্রথম। মরশুমের সময় উৎপন্ন বাড়তি ফসল ও ফল সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে সরকার যৌথ উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে প্রয়োজনীয় এলাকায় আরও ৫০টি নতুন কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করবে।
৮) ক্ষুদ্র চা-বাগান মালিকদের স্বার্থে, কাঁচা চা পাতা উৎপাদনের উপর কৃষি আয়কর (এগ্রিকালচারাল ইনকাম ট্যাক্স) ছাড়ের সময়সীমা আগামী অর্থবর্ষের জন্য অর্থাৎ ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হল এবং একইসঙ্গে চা উৎপাদনের উপর লাগু সেসের ছাড়ও আর এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত করা হল।
৯) এপ্রিল থেকে 'আশা' (ASHA) কর্মীদের মাসিক সাম্মানিক ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল।সরকারের অধীনে অন্য মহিলা কর্মীরা যেমন পেয়ে থাকেন, এখন থেকে আশা কর্মীদের জন্যও ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হবে। এছাড়া কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে তাঁদের নিকট পরিবারকে এককালীন ৫ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। এজন্য আগামী অর্থবর্ষে ১০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করছি।
১০) আইসিডিএস (ICDS) কর্মীরা এই রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। প্রাথমিক শৈশবকালীন যত্ন, শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত পরিষেবা দিয়ে থাকেন। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি সহায়কদের মাসিক সাম্মানিক এপ্রিল থেকে আরও ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল। কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে, আইসিডিএস কর্মীদের নিকট পরিবারকে এককালীন ৫ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব রাখছি। এজন্য আমি আগামী অর্থবর্ষে ২৫০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখছি।
১১) রাজ্যে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্যারা-টিচার, শিক্ষাবন্ধু, সহায়ক/সহায়িকা, সম্প্রসারক, মুখ্য সম্প্রসারক-সহ স্পেশাল এডুকেটর ও ম্যানেজমেন্ট স্টাফ প্রত্যেকের জন্য মাসিক সাম্মানিক এপ্রিল থেকে আরও ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল। কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে এই সকল কর্মীদের নিকট পরিবারও এককালীন ৫ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য পাবেন। এজন্য ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে আমি ১১০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
১২) রাজ্যে বর্তমানে ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ-পুলিশ ও গ্রিন-পুলিশ কর্মী, পুলিশ প্রশাসনকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কাজ করে চলেছেন। তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দিতে আমি আনন্দের সঙ্গে এই সকল কর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক আগামী এপ্রিল ২০২৬ থেকে আরও ১,০০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখছি।বর্তমানে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুতে এই কর্মীদের নিকট পরিবার ৩ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য পান। এঁদের ক্ষেত্রেও এই সাহায্যের পরিমাণ ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হল।
১৩) সরকার অনলাইনে কেনা জিনিসের সরবরাহকে কেন্দ্র করে দ্রুত গড়ে ওঠা নতুন 'গিগ-অর্থনীতি-র' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন। রাজ্যে এই অর্থনীতির সঙ্গে এক বিশালসংখ্যক কর্মী যুক্ত। এই সমস্ত গিগ-কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধির লক্ষ্যে, আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, সকল গিগ-কর্মীদের সরকারের চালু সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় (যেমন স্বাস্থ্যসাথী) আনা হবে।
১৪) কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার প্রতিবাদে রাজ্যের জব কার্ড হোল্ডারদের জন্য কাজ নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে 'কর্মশ্রী' প্রকল্প চালু করেছে, যেটি এখন জাতির জনকের নামে 'মহাত্মাশ্রী' হিসাবে নামাঙ্কিত।
১৫) ক্ষেতমজুর ভাই-বোনেদের জীবিকা, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কাজকর্মের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এই সকল ক্ষেতমজুরদের জন্য ২,০০০ টাকার দুটি কিস্তিতে বার্ষিক মোট ৪,০০০ (চার হাজার) টাকা আর্থিক অনুদানের প্রস্তাব রাখছি। এই অনুদানের একটি কিস্তি রবি চাষের সময় ও অন্যটি খরিফ চাষের সময়ে দেওয়া হবে।
১৬) ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের চাষের খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এখন তাঁদের সরকারি টিউবওয়েল বা নদী-সেচ ব্যবস্থা (RLI) ব্যবহারে যে ফি বা চার্জ দিতে হয়, তা সম্পূর্ণ মকুব করা হল।
১৭) রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের চাহিদার বিষয়ে সম্পূর্ণ সংবেদনশীল। তাঁরা সরকারি নীতি ও প্রকল্প রূপায়ণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজ্যের ষষ্ঠ বেতন কমিশনের সুপারিশের কার্যকাল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে।
১৮) পেনশন প্রাপকদের, রাজ্যের হেলথ স্কিমে চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচ লাঘব করার উদ্দেশ্যে ২ লাখ টাকার বর্তমান ক্যাশলেস সুবিধার সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব । সরকারি প্যানেলভুক্ত হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় তাঁদের চিকিৎসা খরচ ২ লাখ টাকা অতিক্রম করলে, পরবর্তী বাড়তি খরচের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশলেস করা হবে।
১৯) রাজ্যের সরকারি, আধা-সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও অ-শিক্ষক কর্মীবৃন্দ এবং পেনশন প্রাপকদের উপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে রাজ্য সরকার আগামী ১ এপ্রিল চার শতাংশ হারে আরও এক কিস্তি মহার্ঘ ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত ।
২০) রাজ্যের ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি মাধ্যমিক (বা সমতুল্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষিত যুব সমাজকে কর্মসংস্থানের পথে সাহায্য করার জন্য সরকার 'বাংলার যুব-সাথী নামে নতুন প্রকল্প চালু করছে। যাঁরা শিক্ষা সংক্রান্ত বা স্কলারশিপ ছাড়া রাজ্য সরকারের অন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাঁদের কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত সর্বাধিক ৫ বছর পর্যন্ত মাসে ১,৫০০ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। আগামী ১৫ অগস্ট থেকে এই প্রকল্প চালু হবে।
২১) 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পটি বাংলার মা-বোনেদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত সকলের জন্য, মাসিক আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ফেব্রুয়ারি থেকে আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হল।