ফুটবলের মহাযুদ্ধে নতুন অধ্যায়, ৪৮ দলের বিশ্বকাপে কী বদলাবে?

নিজস্ব সংবাদদাতা : ২০২৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে চলেছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত হতে চলেছে এই মহারণ। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে একাধিক নতুন দেশকে। তবে প্রশ্ন উঠছে—এত বড় সম্প্রসারণ কি বিশ্বকাপের সেই চিরচেনা উত্তেজনা ও কঠিন লড়াইয়ের আবহকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দেবে? ফিফা সভাপতি Gianni Infantino দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের পক্ষে জোর সওয়াল করেছিলেন। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংযোগের এক বিশাল উৎসব। সেই ভাবনা থেকেই ৩২ দলের বদলে ৪৮ দলের ফরম্যাট চালু করা হচ্ছে।নতুন ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় লাভ হয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট ফুটবল শক্তিগুলোর। এবার প্রথমবার বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করে নিয়েছে ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ কুরাসাও, আফ্রিকার কেপ ভার্দে, মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডন এবং উজবেকিস্তানের মতো দেশ।

মাত্র ১ লক্ষ ৬০ হাজার জনসংখ্যার দেশ কুরাসাওয়ের কোচ Fred Rutten ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা বিশ্বকাপে চমক দেখাতে প্রস্তুত। নতুন ফরম্যাটে গ্রুপ পর্ব থেকে পরের রাউন্ডে ওঠার সম্ভাবনাও বেড়েছে অনেকটাই। ১২টি গ্রুপের শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দলও শেষ ৩২-এ জায়গা পাবে। ফলে একটি জয় পেলেও নকআউটে ওঠার দরজা খোলা থাকতে পারে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোরই প্রাধান্য ছিল। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে ১৬ দলের মধ্যে ১০টিই ছিল ইউরোপীয়। ১৯৯০ সালে ২৪ দলের বিশ্বকাপে ইউরোপ থেকে অংশ নিয়েছিল ১৪টি দল। অন্যদিকে আফ্রিকা, এশিয়া বা কনকাকাফ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব ছিল খুবই কম। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় এবার ইউরোপ পাবে ১৬টি জায়গা, আফ্রিকা ১০টি, এশিয়া ৯টি, দক্ষিণ আমেরিকা ও কনকাকাফ পাবে ৬টি করে জায়গা। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান Arsene Wenger এই পরিবর্তনকে “ফুটবলের স্বাভাবিক বিবর্তন” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বের আরও বেশি দেশের কাছে ফুটবলকে পৌঁছে দিতেই এই সিদ্ধান্ত।

তবে সমালোচনাও কম নয়। আগের ৩২ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই একাধিক হেভিওয়েট দল বিদায় নিয়েছে। যেমন জার্মানি টানা দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ থেকেই ছিটকে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন ফরম্যাটে বড় দলগুলোর বিদায় এত সহজ হবে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা সৌদি আরবের কাছে হারার পর ভয়াবহ চাপে পড়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর ফরম্যাটে প্রথম ম্যাচ হারলেও বড় দলগুলোর সামনে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে অনেক বেশি। বিশিষ্ট ফুটবল লেখক Jonathan Wilson মনে করছেন, “৩২ দলের বিশ্বকাপই ছিল নিখুঁত। নতুন ফরম্যাটে প্রথম রাউন্ডের রোমাঞ্চ অনেকটাই কমে যেতে পারে।” এছাড়াও এবার চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে খেলতে হবে মোট ৮টি ম্যাচ। উত্তর আমেরিকার গরম আবহাওয়ায় অতিরিক্ত ম্যাচ খেলতে হওয়ায় ফুটবলারদের শারীরিক চাপও বাড়বে বলে আশঙ্কা। নতুন ফরম্যাট বিশ্বকাপকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে, এতে সন্দেহ নেই। ছোট দেশগুলোর স্বপ্নপূরণ হচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র আরও বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বকাপের সেই “হারলেই বিদায়” চাপ, অঘটনের রোমাঞ্চ এবং গ্রুপ পর্বের আগুনে লড়াই কি আগের মতো থাকবে? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ২০২৬ সালে। তবে একথা নিশ্চিত, ফুটবল বিশ্বকাপ এবার এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে।