শেষ পোস্টে ছিল নিরাপদে ফেরার প্রার্থনা, ব্রড পিকেই থেমে গেল নিমস দাইয়ের পথচলা!
নিজস্ব সংবাদদাতা : পাকিস্তানের ৮,০৪৭ মিটার উচ্চতার ব্রড পিক (Broad Peak)-এ ভয়াবহ তুষারধসে প্রাণ হারালেন বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমস’ পুরজা। কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর শনিবার তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। রবিবার পাকিস্তানের আলপাইন ক্লাব জানায়, প্রায় ৫,৭০০ মিটার উচ্চতায় উদ্ধারকারী দল নির্মল পুরজার দেহ উদ্ধার করেছে। একই অভিযানে তাঁর সঙ্গে থাকা আরও নয় জন পর্বতারোহীরও মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। গত বৃহস্পতিবার ব্রড পিকে আকস্মিক তুষারধস নামার পর থেকেই নির্মল পুরজার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অভিযাত্রী দলের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আকাশ ও স্থলপথে টানা কয়েক দিনের তল্লাশির পর শনিবার তাঁর সংস্থা জানায়, অভিযাত্রী দলের কেউই জীবিত নেই।
পাকিস্তানের আলপাইন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আয়াজ শিগরি জানান, নির্মল পুরজাসহ চারজনের দেহ পাহাড় থেকে নিচে নামানোর কাজ চলছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দুই নেপালি ও এক চিনা নাগরিক। আরও একটি দেহ অনেক উঁচুতে শনাক্ত হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে তা আপাতত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।এর আগে শুক্রবার উদ্ধার হওয়া তিন পর্বতারোহীর দেহ স্কার্দুতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওমানের এক মহিলা পর্বতারোহী, এক নেপালি এবং এক মার্কিন নাগরিক।
সেনা থেকে বিশ্বজয়ী পর্বতারোহী
৪৩ বছর বয়সি নির্মল পুরজা, যিনি সারা বিশ্বে ‘নিমস দাই’ নামে পরিচিত, প্রথমে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোর্খা ব্রিগেডে এবং পরে রয়্যাল মেরিনসের অভিজাত স্পেশাল বোট সার্ভিস (SBS)-এ কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ ১৬ বছরের সামরিক জীবনের পর তিনি পূর্ণসময়ের পর্বতারোহী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং একের পর এক বিশ্বরেকর্ড গড়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।
‘প্রজেক্ট পসিবল’—অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প
২০১৯ সালে সামরিক চাকরি ছেড়ে তিনি শুরু করেন তাঁর স্বপ্নের অভিযান ‘প্রজেক্ট পসিবল’। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার সবকটি ১৪টি শৃঙ্গ মাত্র সাত মাসে জয় করা। সেই সময় অনেকেই এই লক্ষ্যকে অবাস্তব বলে মনে করেছিলেন।কিন্তু নির্মল পুরজা বিশ্বকে চমকে দিয়ে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে মাত্র ৬ মাস ৬ দিনে (১৮৯ দিন) বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে ইতিহাস গড়েন। তাঁর এই অবিশ্বাস্য কীর্তি পর্বতারোহণের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করে।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকেই শুরু স্বপ্নের যাত্রা
পর্বতারোহণে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। মূলত এভারেস্ট বেস ক্যাম্প পর্যন্ত ট্রেকিং করতে গিয়েই পাহাড়ের প্রেমে পড়েন তিনি। এরপর এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্য স্থির করেন এবং সফলও হন। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাত থেকে এমবিই (MBE) সম্মানে ভূষিত হওয়ার পরও তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়। সম্প্রতি অক্সিজেনের সহায়তা ছাড়াই বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ দ্বিতীয়বার আরোহণের অভিযানে নেমেছিলেন তিনি।
শেষ পোস্টেই ছিল নিরাপদে ফেরার প্রার্থনা
দুর্ঘটনার কয়েক দিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ব্রড পিক অভিযানের কথা জানিয়ে নির্মল লিখেছিলেন, শৃঙ্গ জয় করে নিরাপদে ফিরে আসাই তাঁর একমাত্র প্রার্থনা। কিন্তু সেই অভিযানই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।
পাহাড়প্রেমীদের হৃদয়ে চিরঅম্লান
নির্মল ‘নিমস’ পুরজা শুধু একজন বিশ্বসেরা পর্বতারোহী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক। তাঁর জীবন হাজার হাজার তরুণ পর্বতারোহীকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আজ তিনি পাহাড়ের বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত, কিন্তু তাঁর সাহস, সংগ্রাম এবং ‘প্রজেক্ট পসিবল’-এর অনুপ্রেরণা আগামী প্রজন্মের পর্বতারোহীদের পথ দেখিয়ে যাবে বহু বছর।