মৃত্যুর আগে দেখা হলো না, মৃত্যুর পর মিলল পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল—এ কেমন রাষ্ট্রের মানবিকতা?

একজন মা মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো তাঁর বন্দি ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন, মৃত্যুর আগে অন্তত একবার সন্তানের মুখটি দেখে যেতে। আবেদন ছিল না কোনও বিশেষ সুবিধার, ছিল না ক্ষমতার দাবি—ছিল শুধু একজন মায়ের শেষ ইচ্ছা।

কিন্তু রাষ্ট্র বলল—সম্ভব নয়।মা চলে গেলেন।তারপর রাষ্ট্র বলল—এবার পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া যেতে পারে।

এর চেয়ে নির্মম পরিহাস আর কী হতে পারে?সন্ধ্যা রাণী ধর কোনও ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি শুধু একজন মা। তাঁর ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বন্দি। মৃত্যুশয্যায় থাকা মা শেষবার ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই আবেদনের ক্ষেত্রেও প্রশাসনের সামনে প্রশ্ন ছিল—আইনের বিধি কী বলে, তার পাশাপাশি মানবিকতার ন্যূনতম জায়গাটি কোথায়?জীবিত মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা করার সুযোগ মিলল না। অথচ মায়ের মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য প্যারোলের সুযোগ তৈরি হল।এই বৈপরীত্যই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আইন অবশ্যই তার নিজের পথে চলবে। কোনও বন্দির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিচার হবে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত। কিন্তু অভিযোগ আর অপরাধ এক বিষয় নয়। বিচারাধীন একজন মানুষকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করারও সুযোগ নেই।আর একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের সঙ্গে তাঁর সন্তানের শেষ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ নয়। এটি রাষ্ট্রের মানবিক বিবেচনার পরীক্ষা।প্রশাসনের কাজ শুধু বিধি দেখানো নয়; বিধির মধ্যে মানবিকতার যে পরিসর থাকে, প্রয়োজনে সেই পথও খুঁজে বের করা। বিশেষত যখন বিষয়টি কোনও রাজনৈতিক দাবি নয়, কোনও আর্থিক সুবিধা নয়—একজন মায়ের শেষ ইচ্ছা।এই ঘটনাকে ঘিরে আর একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে যখন উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, তখন ভারতের তথাকথিত উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের একটি অংশ কেন অনেক সময় এই ধরনের ঘটনায় নীরব থাকে?ধর্মনিরপেক্ষতা অবশ্যই কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের পক্ষ নেওয়া নয়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত অর্থ যদি হয় প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতি সমান সংবেদনশীলতা—তবে নিপীড়িত মানুষটি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বা অন্য কোনও সম্প্রদায়ের, সেই প্রশ্নে নীতির পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়।সেকুলার হওয়া অপরাধ নয়। বরং একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই ধর্মনিরপেক্ষতা যদি কোনও একটি সম্প্রদায়ের যন্ত্রণা দেখার ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার নৈতিক অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।গেরুয়া পোশাক দেখে বিদ্রূপ করার আগে ইতিহাসের দিকে তাকানো দরকার। গেরুয়া শুধু একটি রং নয়—ভারতীয় ঐতিহ্যে এটি ত্যাগ, সন্ন্যাস, সাধনা ও আত্মনিবেদনের প্রতীক। শ্মশানের ছাই নিয়েও ঠাট্টা করার আগে মনে রাখা উচিত, এই ভারতভূমিতেই অসংখ্য সাধক জীবন-মৃত্যুর অর্থ খুঁজতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।আজকের ঘটনাকে তাই শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের চশমায় দেখা উচিত নয়। একজন সন্তান তাঁর মৃত মায়ের শেষ বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে আছেন—এই দৃশ্যটিকে অন্তত একবার মানুষের চোখে দেখা দরকার।কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু আইন প্রয়োগে নয়, প্রয়োজনে মানবিক হওয়ার ক্ষমতাতেও প্রকাশ পায়।একজন মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণে যদি রাষ্ট্র জীবিত অবস্থায় পথ খুঁজে না পায়, অথচ মৃত্যুর পর সেই একই সন্তানের জন্য প্যারোলের পথ খুলে যায়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই:

আইন কি শুধু বিধির অক্ষর, নাকি তার ভেতরেও একটু মানবিকতার জায়গা রয়েছে?

আজ প্রশ্নটি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে নিয়ে। আগামীকাল প্রশ্নটি অন্য কারও হতে পারে।অন্যের ঘরের আগুনকে রাজনৈতিক পরিচয়ের চশমায় দেখে হাসার আগে তাই একবার থামুন। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—অন্যের যন্ত্রণা উপেক্ষা করার অভ্যাস শেষ পর্যন্ত কোনও সমাজকেই নিরাপদ রাখে না।মানুষের পরিচয়ই সবার আগে। রাষ্ট্রের কাছে সেই মানবিকতার পরীক্ষাই সবচেয়ে বড়।