বাংলা ভাষার জন্ম কি শুধুই সংস্কৃত থেকে? ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা!

মৃদুল শ্রীমানী : বাংলা ভাষা সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে এর ইতিহাস ও বিকাশ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকা জরুরি। বাংলা ভাষার জন্মের ইতিহাস মোটেই সরল বা একরৈখিক নয়। অনেকের ধারণা, বাংলা সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। সংস্কৃত যেমন একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন থেকে গড়ে ওঠা উচ্চমার্গীয় ভাষা, তেমনই বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে দীর্ঘ বিবর্তনের পথে, বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে।একটি আধুনিক ভাষা যেমন সময়ের সঙ্গে নানা উৎস থেকে শব্দ, ব্যাকরণ ও অভিব্যক্তি গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়, বাংলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, যতিচিহ্নের ব্যবহার এবং আধুনিক বাক্যগঠনে ইংরেজি ভাষার প্রভাব সুস্পষ্ট। পাশাপাশি ফরাসি, পর্তুগিজসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষার বহু শব্দ বাংলায় স্থান করে নিয়েছে। তারও আগে পাঠান ও মুঘল আমলে আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষার অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। এই সংমিশ্রণ ছিল স্বাভাবিক ও জৈবিক—কৃত্রিম নয়।ভাষাবিদদের মতে, বৈদিক বা ছান্দস ভাষা থেকে দীর্ঘ পরিবর্তনের ধারায় প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট প্রভৃতি স্তর অতিক্রম করে আধুনিক ভারতীয় আর্য ভাষাগুলির বিকাশ ঘটেছে। তবে ভাষার জন্ম ও বিকাশ প্রকৃতির মতোই রহস্যময়। এ বিষয়ে যতটা জানা গেছে, তার চেয়ে অজানা অংশ অনেক বড়। তাই ভাষার ইতিহাস বিশ্লেষণে গবেষণা, তুলনামূলক অধ্যয়ন এবং যুক্তিনির্ভর অনুমানেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া এবং নেপালির মতো ভাষার বিকাশেও এই দীর্ঘ বিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। একই সঙ্গে কোল, ভীল, মুণ্ডা, হো-সহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষারও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে বাংলার শব্দভাণ্ডারে। এছাড়া গ্রিক, তামিল, তেলুগুসহ আরও নানা ভাষার প্রভাবও বিচ্ছিন্নভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। ভাষাবিদেরা বাংলা শব্দকে তৎসম, তদ্ভব ও দেশজ—এই কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে বাংলা ভাষা মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহার, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে।এই কারণেই বাংলা কোনো একক অঞ্চল বা উপভাষার নাম নয়। ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ক্রমাগত পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের কথ্যরূপকেই বাংলা ভাষার একমাত্র পরিচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলা একটি জীবন্ত ভাষা, যার শক্তি তার বহুমাত্রিকতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত।হিন্দি ভাষার সঙ্গেও বাংলার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আধুনিক যুগে বহু বাংলা উপন্যাস হিন্দিতে অনূদিত হয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। একইভাবে বাংলা সাহিত্য ও গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মিত অসংখ্য হিন্দি চলচ্চিত্রও দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। দুই ভাষার এই পারস্পরিক আদান-প্রদান ভারতীয় ভাষা-সংস্কৃতির ঐক্য ও বহুত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ভাষার মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহাবস্থান ও পারস্পরিক সমৃদ্ধিই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি।