লোধাদের জীবন বদলানোর লড়াইয়ে যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই প্রবোধকুমার ভৌমিক!

নিজস্ব সংবাদদাতা : ৬ সেপ্টেম্বর ১৯২৬। পূর্ব মেদিনীপুরের আমদাবাদ গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর কাছে নৃতত্ত্ব শুধু মানুষের জীবনকে বইয়ের পাতায় বিশ্লেষণ করার বিজ্ঞান ছিল না—ছিল মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের জীবন বদলে দেওয়ার দায়বদ্ধতাও। তিনি অধ্যাপক প্রবোধকুমার ভৌমিক।আজ তাঁর জন্মদিন। একইসঙ্গে ১৯৪২ সালের এই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর জীবনের এক গৌরবময় অধ্যায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। টানা প্রায় আড়াই বছর কারাবন্দি থাকতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কারাগারের অন্ধকারও তাঁর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।১৯৪৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কলাগেছিয়া জগদীশ বিদ্যাপীঠ থেকে একাধিক বিষয়ে লেটার-সহ ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। এরপর কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে নৃতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছরই বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে যোগ দেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ধীরে ধীরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্বও পান এবং সিনেটের সদস্য হন।তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়েছিল শ্রেণিকক্ষের বাইরের কাজে।

লোধাদের জীবন নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণা

পশ্চিমবঙ্গের লোধা জনজাতির জীবন, সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন প্রবোধকুমার ভৌমিক। ঔপনিবেশিক আমলে ‘Criminal Tribe’ হিসেবে কলঙ্কিত এই জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার পরেও নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। তাঁদের সেই বাস্তব জীবনকে কাছ থেকে বুঝতে মাঠে নেমেছিলেন তিনি।মেদিনীপুরের ৩১টি গ্রামের ৪০৮টি পরিবারকে নিয়ে তিনি বিস্তৃত সমীক্ষা চালান। এই সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ১,০৪০ জন পুরুষ এবং ৯৬৭ জন মহিলা। সেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Lodhas of West Bengal: A Socio-Economic Study’-তে।

লোধাদের জীবন ও সমাজকে বোঝার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থ আজও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম হিসেবে বিবেচিত।১৯৬১ সালে তিনি ডক্টরেট এবং ১৯৬৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন।লোধাদের পাশাপাশি সাঁওতাল, মুন্ডা, খেরিয়া, মাহালি, চেঞ্চু-সহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন নিয়েও গবেষণা করেছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘Socio-Cultural Profile of Frontier Bengal’, ‘The Chenchus of the Forests and Plateaus’, ‘Applied—Action—Development Anthropology’ এবং ‘Customary Law of Austric Speaking Tribes’

গবেষণা থেকে সরাসরি সমাজের কাজে

প্রবোধকুমার ভৌমিকের কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—গবেষণার ফলাফলকে তিনি কেবল বইয়ের পাতায় আটকে রাখেননি। লোধাদের শিক্ষা, পুনর্বাসন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে নারায়ণগড়ের ফুলগেড়িয়া মৌজায় প্রায় ৫০-৬০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন ‘বিদিশা’। পরবর্তী সময়ে ১৯৬১-৬২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করে।লোধা শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য বিদিশায় একের পর এক উদ্যোগ গড়ে ওঠে। সমাজসেবক সংঘের উদ্যোগে ১৯৬৫ সালের ১১ এপ্রিল শুরু হয় লোধা শিশুদের পরিবার থেকে এনে শিক্ষার পরিবেশে গড়ে তোলার কাজ। ১৯৬৬ সালের ৩০ জুন উদ্বোধন হয় লোধা ছাত্রদের আবাসন ‘কালকেতু অঙ্গন’। ১৯৬৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে চালু হয় ‘বিশ্ববসু অঙ্গন’ এবং ১৯৭৩ সালে ছাত্রীদের জন্য উদ্বোধন করা হয় ‘ফুল্লরা অঙ্গন’।বিদিশা হয়ে ওঠে শুধু আশ্রম বা গবেষণাকেন্দ্র নয়, প্রান্তিক মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পুনর্বাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

‘কণ্ববন’ থেকে সংস্কৃতি সংগ্রহশালা

বিদিশায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন চিড়িয়াখানা ‘কণ্ববন’। পাশাপাশি তৈরি করেন নির্মল বসু স্মৃতি কক্ষ, বারীন ঘোষ স্মৃতি কক্ষ, রাঢ় সংস্কৃতি সংগ্রহশালা, গ্রন্থাগার, ক্রেশ-বালওয়াড়ি কেন্দ্র, শিশু রক্ষণাগার-সহ নানা প্রতিষ্ঠান। ছিল নৌবিহারের ব্যবস্থাও। হরিণদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল মুক্তাঞ্চল।বিদিশার বিভিন্ন আবাস ও কুটিরের নামকরণেও ছিল তাঁর নিজস্ব ছাপ—কালকেতু অঙ্গন, ফুল্লরা অঙ্গন, স্বপ্ন সন্ধ্যা, পাঞ্চালী, বিশ্বাবসু অঙ্গন, বকুল, রূপমতী, আম্রপালি, জতুগৃহ—এমন বহু নাম আজও তাঁর ভাবনার সাক্ষ্য বহন করে।লোধাদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনকে কেন্দ্র করে তাঁর এই কাজ ভারতীয় নৃতত্ত্বে ‘Action Anthropology’-র এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। মানুষের জীবন নিয়ে গবেষণা করে সেই গবেষণার ভিত্তিতেই তাঁদের উন্নয়নের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া—এই ভাবনাই ছিল তাঁর কাজের মূল ভিত্তি।লোধাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এতটাই গভীর হয়েছিল যে তাঁকে স্নেহ করে অনেকে ‘Lodha Bhowmick’ নামে ডাকতেন। বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ বিজয় সাহায় তাঁকে অভিহিত করেছিলেন ‘Messiah of the Lodhas’ নামে।

মানুষকে বোঝা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো

প্রবোধকুমার ভৌমিকের জীবন তাই শুধুমাত্র একজন অধ্যাপকের জীবন নয়। এটি এক গবেষকের সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প। তিনি দেখিয়েছিলেন, নৃতত্ত্ব শুধু মানুষের সংস্কৃতি, সমাজ ও জীবনযাত্রা বোঝার বিষয় নয়—প্রয়োজনে সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবন বদলের কাজেও ব্যবহার করা যায়।২০০৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসান হয়। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদিশা এবং তাঁর গবেষণাকর্ম আজও তাঁর চিন্তা ও আদর্শের স্মারক হয়ে রয়েছে।৬ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। একইসঙ্গে ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর কারাবরণের স্মৃতিও এই সময়কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।একদিকে স্বাধীনতার আন্দোলনে কিশোর বয়সে কারাবরণ, অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য আজীবন সংগ্রাম—অধ্যাপক প্রবোধকুমার ভৌমিকের জীবন তাই এক বিরল আদর্শের নাম।তাঁর জন্মদিনে এই বিশ্ববরেণ্য নৃতত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ ও মানবদরদী সমাজসংস্কারককে গভীর শ্রদ্ধা জানায় বিপ্লবী সংবাদ দর্পণ