এক যুগের অবসান—আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় জানালেন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি

নিজস্ব সংবাদদাতা : শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি। প্রায় দুই দশক ধরে দেশের হয়ে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা করলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের পর্দা নামল এক আবেগঘন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।৩৯ বছর বয়সি মেসি এক আবেগঘন বার্তায় জানিয়েছেন, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের দু’দিন পর, অর্থাৎ ২১ জুলাই, প্রথমবার অবসরের বার্তাটি লিখেছিলেন তিনি। এরপর নানা ঘটনা এবং পারিবারিক পরিস্থিতি তাঁকে আরও নিশ্চিত করেছে যে, জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর এটাই সঠিক সময়।

মেসি বলেন, “ফাইনালের পর এতদিন ধরে সবকিছু নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমি সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। সিদ্ধান্তটি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, এখনও গভীরভাবে কষ্ট দেয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।”২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয়েছিল মেসির। তারপর থেকে দীর্ঘ পথচলায় সাফল্যের পাশাপাশি তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং তীব্র মানসিক চাপও। ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ সাফল্য পেলেও দীর্ঘদিন জাতীয় দলের হয়ে বড় ট্রফি না জেতায় বারবার তাঁকে ডিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, এরপর ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের টানা কোপা আমেরিকা ফাইনালে পরাজয়—মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের অন্যতম কঠিন সময় ছিল সেটি। ২০১৬ সালে চিলির বিরুদ্ধে কোপা আমেরিকা ফাইনালে হারের পর একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও করেছিলেন তিনি। তবে পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলে আবার জাতীয় দলে ফিরে আসেন।আর সেই প্রত্যাবর্তনের পরই বদলে যায় আর্জেন্টিনার ফুটবলের ইতিহাস।২০২১ সালের কোপা আমেরিকায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটান মেসি। ব্রাজিলের মারাকানায় আয়োজিত ফাইনালে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালিসিমা জয়ের পর আসে মেসির কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।কাতার বিশ্বকাপে দুরন্ত পারফরম্যান্স করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। টুর্নামেন্টে সাতটি গোল এবং তিনটি অ্যাসিস্ট করে তিনি দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে টাইব্রেকারে জয় পাওয়ার পর অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।এরপর ২০২৪ সালে ফের কোপা আমেরিকা জিতে শিরোপা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন মেসি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছলেও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন মেসি।তিনি বলেন, “আমি শপথ করে বলতে পারি, সবসময় আমি আমার সবকিছু দিয়েছি। শুধু এই শেষ কয়েক বছর নয়, যখন আমরা সবকিছু জিতেছি, তার আগেও। এই জার্সির জন্য আমি সবসময় লড়েছি, মানুষকে আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত করতে চেয়েছি।”আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাচ্ছেন মেসি। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল সময় পার করেছে।একটি দীর্ঘ যুগের সমাপ্তি ঘটলেও মেসির বিদায়ী বার্তায় উঠে এসেছে ভবিষ্যতের কথাও। নতুন প্রজন্মের আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের উপর আস্থা রেখে তিনি জাতীয় দলের পথচলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।দুই দশকের লড়াই, চোখের জল, ব্যর্থতা, প্রত্যাবর্তন এবং একের পর এক ঐতিহাসিক সাফল্যের পর—আন্তর্জাতিক মঞ্চে শেষবারের মতো পর্দা নামালেন লিওনেল মেসি। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল লেখা থাকবে সোনার অক্ষরে।