আলো নিভলেও থামেনি বিজ্ঞানচর্চা, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ স্কুলের পড়ুয়াদের অভিনব অভিজ্ঞতা!

নিজস্ব সংবাদদাতা : বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। চারপাশে নেমেছে অন্ধকার। অথচ থেমে নেই বিজ্ঞানচর্চা। মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে চলছে পর্যবেক্ষণ, প্রশ্নোত্তর এবং হাতে-কলমে শেখার কাজ। প্রতিকূলতার মধ্যেও জানার আগ্রহ যে থেমে থাকে না, তারই এক অভিনব ছবি দেখা গেল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবসের ছুটির দিনেই মেদিনীপুরের ১২টি বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিল এক বিশেষ বিজ্ঞান-শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিবেশ, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং শিক্ষক-গবেষকদের কাজ কাছ থেকে জানার সুযোগ পেল তারা। এই উদ্যোগের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল এবং তাঁর গবেষক ছাত্র চন্দন মাণ্ডার পরিচালনায় উদ্ভিদবিদ্যার হাতে-কলমে পাঠ।বিশ্ববিদ্যালয়ের Incubation Centre এবং IQAC Cell-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানশিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাজগতের সরাসরি সংযোগ তৈরি করা। শুধু বক্তৃতা শোনানো নয়, বরং বাস্তবে দেখিয়ে, বুঝিয়ে এবং প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞানকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়।

ছুটির দিনেও বিজ্ঞানের টানে বিশ্ববিদ্যালয়ে : ২৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে ছুটি ছিল। কিন্তু সেই ছুটি কৌতূহলী পড়ুয়াদের বিজ্ঞানকে কাছ থেকে জানার আগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মেদিনীপুরের ১২টি বিদ্যালয় থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যে বিষয়গুলি তারা এতদিন বই, ছবি কিংবা শিক্ষকের ব্যাখ্যার মাধ্যমে জেনেছে, সেগুলিকে বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা ছিল তাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, গবেষণার পদ্ধতি, নমুনা পর্যবেক্ষণ এবং উদ্ভিদবিদ্যার নানা বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ পায় তারা।এই উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই—বিজ্ঞানকে কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং প্রশ্ন করা, পর্যবেক্ষণ করা এবং যুক্তির সাহায্যে উত্তর খোঁজার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরা।

শ্রেণিকক্ষ থেকে গবেষণাগার—হাতে-কলমে বিজ্ঞানশিক্ষা : বইয়ে কোনও উদ্ভিদের ছবি দেখা আর বাস্তবে সেই উদ্ভিদের গঠন ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা এক নয়। এই পার্থক্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় কর্মসূচিতে।অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল এবং তাঁর গবেষক ছাত্র চন্দন মাণ্ডা ছাত্রছাত্রীদের উদ্ভিদবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় সরাসরি দেখিয়ে বোঝান। উদ্ভিদের গঠন, বৈশিষ্ট্য, পরিচিতি এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পড়ুয়াদের শুধু শুনে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং নিজেদের প্রশ্ন তুলে ধরার এবং পর্যবেক্ষণের সঙ্গে শিক্ষকদের ব্যাখ্যা মিলিয়ে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।কোনও উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য কী, তার গঠন এমন কেন, কোন পরিবেশে সেটি জন্মায় কিংবা পরিবেশের সঙ্গে তার অভিযোজন কীভাবে ঘটে—এই ধরনের প্রশ্নের মধ্য দিয়েই বিজ্ঞানকে বোঝার আগ্রহ তৈরি হয়। শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পড়ুয়াদের সেই অনুসন্ধিৎসাকে আরও উৎসাহিত করে।

লোডশেডিংয়ের মধ্যেও জ্বলল জ্ঞানের আলো : কর্মসূচি চলাকালীন বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তৈরি হয় অসুবিধা। কিন্তু আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা বন্ধ হয়ে যায়নি। প্রয়োজনের মুহূর্তে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা চালিয়ে যান শিক্ষক-গবেষকরা এবং ছাত্রছাত্রীরা।কেউ মোবাইলের আলো ধরে রাখছে, কেউ সেই আলোয় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে, আবার কেউ প্রশ্ন করছে কিংবা ব্যাখ্যা শুনছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ঘটনা হলেও কর্মসূচির সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে এই দৃশ্যই।আধুনিক বিজ্ঞানশিক্ষায় উন্নত গবেষণাগার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম চালিকাশক্তি হল কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং জানার ইচ্ছা। প্রতিকূলতা এলেও সেই আগ্রহকে ধরে রাখা সম্ভব।

বিদ্যাসাগরের আদর্শের সঙ্গে প্রতীকী যোগ : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা দিবসের দিনেই অন্ধকারের মধ্যে মোবাইলের আলোয় পড়ুয়াদের বিজ্ঞানচর্চার দৃশ্য এক প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। শিক্ষা বিস্তার, যুক্তিবাদ এবং সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান আজও প্রাসঙ্গিক।সেই প্রেক্ষাপটে এই কর্মসূচি মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল নির্দিষ্ট সময়, শ্রেণিকক্ষ কিংবা পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, পর্যবেক্ষণের সুযোগ এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহই শিক্ষাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন : এই কর্মসূচির আয়োজক Incubation Centre এবং IQAC Cell-এর উদ্যোগে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগৎ সম্পর্কে পড়ুয়াদের ধারণা আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা গবেষণার কাজ সম্পর্কে জানতে পারে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কেও তাদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষাগত যোগাযোগ আরও মজবুত হতে পারে। ভবিষ্যতে উদ্ভিদবিদ্যা, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে আরও হাতে-কলমে কর্মসূচি আয়োজনের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

একটি দিনের কর্মসূচি, বড় এক বার্তা : বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগের কেন্দ্রে ছিল তিনটি বিষয়—শিক্ষকের অভিজ্ঞতা, গবেষকের অনুসন্ধান এবং ছাত্রছাত্রীদের কৌতূহল। অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল ও গবেষক চন্দন মাণ্ডার হাতে-কলমে পাঠ সেই সংযোগকে বাস্তব রূপ দেয়। কর্মসূচির স্মরণীয় মুহূর্তগুলি ক্যামেরাবন্দি করেন প্রিয়াঙ্কা হালদার।প্রতিষ্ঠা দিবসের ছুটিতে ১২টি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এই অংশগ্রহণ এবং লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বিজ্ঞানচর্চা চালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে নিয়ে আসে—শেখার জন্য আগ্রহ ও উদ্যোগ অপরিহার্য।আলো নিভে যেতে পারে, বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, সাময়িক অসুবিধাও দেখা দিতে পারে। কিন্তু জানার ইচ্ছা অটুট থাকলে শিক্ষা থেমে থাকে না। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কর্মসূচি তাই শুধু একটি বিজ্ঞান-শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নয়; বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে গবেষণার জগতের পরিচয় ঘটানোর একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়াস।বার্তা একটাই—ছুটির দিন হতে পারে, আলো নিভতে পারে, কিন্তু শেখার কোনও ছুটি নেই।