তিস্তায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরল শাবক, মায়ের ডাকে ছুটে এসে সন্তানকে আগলে জঙ্গলে ফিরল মা হাতি!
নিজস্ব সংবাদদাতা : উত্তাল তিস্তার স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল ছোট্ট একটি হস্তিশাবক। চারপাশে শুধু প্রবল জলস্রোত। সেই পরিস্থিতিতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিঙি নৌকা ছুটিয়ে নদীতে নামলেন পাঁচ মৎস্যজীবী। প্রায় চার কিলোমিটার টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হল অসহায় শাবকটি। আর উদ্ধারের পর তৈরি হল আরও আবেগঘন এক দৃশ্য—সন্তানের ডাক শুনে ছুটে এল মা হাতি। নিজের বিশাল শরীর দিয়ে সন্তানকে আগলে নিয়ে ফিরে গেল জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে।
সোমবার সকালে জলপাইগুড়ির গজলডোবা তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। উত্তরবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরামের কয়েকজন সদস্য দেখতে পান, তিস্তার জলে ভেসে যাচ্ছে একটি হস্তিশাবক। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দেরি না করে ক্রান্তি-পাঞ্জাব বাঁধ থেকে ডিঙি নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন পাঁচ মৎস্যজীবী—মিঠু দাস, রাজেশ দাস, বিশ্বনাথ দাস, গোপাল দাস ও বাবলু দাস।
প্রবল স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে তাঁরা নৌকা এগিয়ে নিয়ে যান শাবকটির দিকে। সহজ ছিল না সেই উদ্ধার অভিযান। প্রায় চার কিলোমিটার ধরে জল ও মানুষের মধ্যে চলতে থাকে টানাটানি। শেষ পর্যন্ত হস্তিশাবকটিকে নৌকায় তুলতে সক্ষম হন তাঁরা। এরপর নিরাপদে তাকে ডাঙায় নিয়ে আসা হয় এবং বনদপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
উদ্ধারকারী মিঠু দাস বলেন, “আমরা দেখতে পেলাম হস্তিশাবকটি জলে ভেসে যাচ্ছে। এরপর বাঁচাতে নদীতে নেমে পড়ি। কোনওরকমে উদ্ধার করি। আমরা খুব খুশি।”তবে উদ্ধারের পর যে দৃশ্য সামনে আসে, তা ছাপিয়ে যায় সমস্ত উত্তেজনা। শাবকটির ডাক শুনে দূর থেকে ছুটে আসে তার মা। কাছে এসে নিজের সন্তানকে বিশাল শরীর দিয়ে প্রায় ঢেকে ফেলে মা হাতিটি। কিছুক্ষণ সন্তানকে আগলে রাখার পর তাকে সঙ্গে নিয়েই জঙ্গলের দিকে ফিরে যায়।
এই আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী থাকা মানুষজনের চোখে-মুখে তখন বিস্ময়। বন্যপ্রাণীর প্রতি মায়ের টান যে মানুষের মাতৃত্বের অনুভূতির মতোই গভীর, তিস্তাপারের সেই দৃশ্য যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠে।বনদপ্তরের এক আধিকারিক জানান, “উত্তাল নদী থেকে পাঁচ মৎস্যজীবী অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে হস্তিশাবকটিকে উদ্ধার করেছেন। পরে শাবকটিকে তার মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
কাঠামবাড়ি, সালুগাড়া ও বেলাকোবা রেঞ্জের যৌথ প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মা ও শাবককে নিরাপদে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি হস্তিশাবকের জীবনরক্ষার কাহিনি নয়, বরং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল নজিরও।