আইআইটি খড়গপুরে ফের ছাত্রমৃত্যু: সাফল্যের আলোয় ঢেকে যাচ্ছে কি গভীর সংকটের ছায়া?

দেশের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Indian Institute of Technology আবারও শোকস্তব্ধ। ২৮ এপ্রিল এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে উচ্চশিক্ষার জগতে লুকিয়ে থাকা মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তব।মৃত ছাত্র সোহম হালদার, বয়স মাত্র ২২। ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এমটেকের ছাত্র ছিলেন তিনি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, হস্টেলের ঘর থেকেই তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনার পরই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।তবে প্রশ্ন উঠছে আরও গভীরে—মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে একই ক্যাম্পাসে দ্বিতীয় ছাত্রমৃত্যু কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এটি একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত?

‘সেরা’ হওয়ার দৌড়ে ক্লান্ত প্রজন্ম :

আইআইটিতে পৌঁছনো মানেই দেশের কঠিনতম প্রতিযোগিতার একটিতে সাফল্য। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্যে অল্প কয়েকজনই এই সুযোগ পান। পরিবার, সমাজ—সবাই তাঁদের দেখে “সাফল্যের প্রতীক” হিসেবে। কিন্তু সেই পরিচয়ের ভারই অনেক সময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চাপ।মনোবিদদের মতে, ছোটবেলা থেকেই “সাফল্যই সব”—এই ধারণায় বড় হওয়া বহু ছাত্র প্রথমবার আইআইটিতে এসে বুঝতে পারেন, এখানে সবাই সমান মেধাবী। যাঁরা সবসময় প্রথম ছিলেন, তাঁরাও হঠাৎ নিজেকে গড়পড়তা মনে করতে শুরু করেন—এই মানসিক ধাক্কা অনেকের পক্ষে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বাইরের হাসির আড়ালে ভাঙনের গল্প :

বিশাল ক্যাম্পাস, কঠিন পাঠ্যক্রম, গবেষণার চাপ, প্লেসমেন্টের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অদৃশ্য চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার থেকে দূরে থাকা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।এক প্রাক্তন ছাত্রের কথায়, “এখানে সবাই দৌড়চ্ছে—কেউ ইন্টার্নশিপের জন্য, কেউ বিদেশে পড়ার জন্য। ধীরে ধীরে নিজের কষ্ট লুকোনোই অভ্যাস হয়ে যায়।”বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লুকোনো চাপই সবচেয়ে বিপজ্জনক। বাইরে সব স্বাভাবিক দেখালেও ভিতরে ভিতরে অনেকেই ভেঙে পড়ছেন।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা :

ভারতীয় সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা সীমিত। উদ্বেগ, অবসাদ বা মানসিক ক্লান্তিকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বরং “দুর্বলতা” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কথায়, “মেধাবী ছাত্র মানেই মানসিকভাবে শক্ত—এই ধারণা ভুল। বরং অনেক সময় তাঁদের উপর চাপ আরও বেশি থাকে।”পরিবারের প্রত্যাশাও চাপ বাড়ায়। “তোমাকেই সফল হতে হবে”, “ব্যর্থতার জায়গা নেই”—এই কথাগুলি ধীরে ধীরে মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

প্লেসমেন্টের দৌড় এবং আত্মমূল্য :

আইআইটির আরেকটি বাস্তবতা হল প্লেসমেন্ট সংস্কৃতি। কে কত প্যাকেজ পেল, কোন কোম্পানিতে চাকরি হল—এই তুলনা ছাত্রদের আত্মমূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেয়। ফলে অনেকেই নিজেদের মূল্য শুধুই সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করতে শুরু করেন।শিক্ষাবিদদের মতে, এই “পারফরম্যান্স কালচার” ধীরে ধীরে ছাত্রদের মানবিক দিককে ক্ষয় করছে।

সমাধান কি শুধুই কাউন্সেলিং?

প্রতিষ্ঠানগুলিতে কাউন্সেলিং সেন্টার থাকলেও, অনেক ছাত্র সেখানে যেতে সংকোচ বোধ করেন। এখনও মানসিক চিকিৎসা নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক বড় বাধা।বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান শুধুই হেল্পলাইন নয়। প্রয়োজন সহানুভূতিশীল পরিবেশ, মেন্টরশিপ, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং ব্যর্থতাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি।

একটি মৃত্যু, অসংখ্য প্রশ্ন :

প্রতিবার এমন ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সব থেমে যায়। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে সেই ক্ষতি চিরস্থায়ী।একটি তরুণ প্রাণের হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি সংখ্যা নয়—তার সঙ্গে হারিয়ে যায় অসংখ্য স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং একটি ভবিষ্যৎ?