একসময় ব্যাট হাতে বোলারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া বিনোদ কাম্বলি আজ চিকিৎসাধীন বৃদ্ধাশ্রমে!
নিজস্ব সংবাদদাতা : একসময় তাঁর ব্যাটে ঝড় উঠত। বাঁ-হাতি ব্যাটিংয়ের নান্দনিকতা, চোখধাঁধানো স্ট্রোক আর অনায়াস আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ হতেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বড় স্বপ্ন। মনে হয়েছিল, ভারতীয় ক্রিকেটের আকাশে আরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটেছে।তিনি বিনোদ কাম্বলি।আজ সেই বিনোদ কাম্বলির একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই আবেগপ্রবণ ক্রিকেটবিশ্ব। ৫৪ বছর বয়সি প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার বর্তমানে থানের Nidan Centre for Elderly Care-এ চিকিৎসাধীন। সাম্প্রতিক ভিডিওতে তাঁকে কথা বলতে যথেষ্ট অসুবিধায় পড়তে দেখা যায়। তবে তাঁর বক্তব্যে ছিল ইতিবাচকতার সুর। কেন্দ্রটির পরিষেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং সেখানকার মানুষজনের ভালোবাসার কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে।একসময় যাঁর পরিচয় ছিল ক্রিকেট মাঠের দুরন্ত প্রতিভা হিসেবে, আজ তাঁকে এই অবস্থায় দেখে স্বাভাবিকভাবেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে ক্রিকেটপ্রেমীদের।
শচীনের সঙ্গে সেই ৬৬৪ রানের জুটি : কাম্বলির গল্প শুরু করলে শচীন তেন্ডুলকরের নাম আসবেই। দু’জন ছিলেন স্কুলজীবনের বন্ধু এবং একই ক্রিকেট-গুরুর কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রতিভাবান দুই কিশোর।স্কুল ক্রিকেটে তাঁদের সেই ঐতিহাসিক ৬৬৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি আজও ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। কাম্বলি করেছিলেন ৩৪৯ রান। সেই ম্যাচ থেকেই বোঝা গিয়েছিল, ছেলেটির মধ্যে কিছু একটা আছে।শচীন ও কাম্বলি—একই মাঠ থেকে উঠে আসা দুই বন্ধু। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁদের ক্রিকেটজীবনের পথ একেবারে ভিন্ন দিকে চলে যায়।
১৭ টেস্টেই যেন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিভা : কাম্বলি ভারতের হয়ে মাত্র ১৭টি টেস্ট খেলেছিলেন। তাতেই তাঁর সংগ্রহ ১,০৮৪ রান, ব্যাটিং গড় ৫৪.২০। চারটি শতরানের মধ্যে ছিল দুটি দ্বিশতরান। ১৯৯৩ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২২৪ এবং পরের টেস্টেই জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ২২৭ রান করেছিলেন তিনি।আরও বিস্ময়কর, মাত্র ১৪ ইনিংসে ১,০০০ টেস্ট রান পূর্ণ করেছিলেন কাম্বলি—ভারতীয় ক্রিকেটে এখনও আলোচিত একটি রেকর্ড।একদিনের ক্রিকেটেও খেলেছেন ১০৪টি ম্যাচ। সংগ্রহ ২,৪৭৭ রান, রয়েছে দুটি শতরান। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর পথ দীর্ঘ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালেই জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেন তিনি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮।
প্রশ্নটা থেকেই যায়—কেন থেমে গেলেন কাম্বলি?এখানেই তাঁর গল্প সবচেয়ে বেশি ভাবায়।একই স্কুল থেকে উঠে আসা দুই বন্ধু। একই কোচের কাছে ক্রিকেট শিক্ষা। দু’জনের হাতেই ছিল অসাধারণ প্রতিভা। অথচ একজন হয়ে উঠলেন বিশ্ব ক্রিকেটের কিংবদন্তি, আর অন্যজনের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার থেমে গেল খুব তাড়াতাড়ি। কেন? এর কোনও একক উত্তর নেই। কাম্বলির কেরিয়ারের ওঠানামার পিছনে ফর্ম, নির্বাচনের সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং পেশাদার জীবনের নানা বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হয়েছে। তাই তাঁর পুরো জীবনকে শুধু একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।তবে তাঁর গল্প থেকে একটি বড় শিক্ষা নেওয়া যায়—প্রতিভা সাফল্যের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখতে প্রয়োজন ধারাবাহিকতা।
তিনটি ‘ডি’—নিষ্ঠা, সংকল্প, শৃঙ্খলা - জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে সাফল্যের কথা বললেই তিনটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—Dedication. Determination. Discipline.
অর্থাৎ—নিষ্ঠা, দৃঢ় সংকল্প এবং শৃঙ্খলা।প্রথম সাফল্য পাওয়া যতটা কঠিন, অনেক সময় তার চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে সেই সাফল্যকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা। কারণ সাফল্যের সঙ্গে আসে পরিচিতি, প্রত্যাশা, চাপ এবং নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ।কাম্বলির জীবন তাই শুধুই একজন ক্রিকেটারের উত্থান-পতনের গল্প নয়। এটি আত্মবিশ্লেষণেরও গল্প। আজও হার মানেননি সেই যোদ্ধা : সাম্প্রতিক ভিডিওটি দেখলে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল—শারীরিক অসুবিধার মধ্যেও কাম্বলি নিজের আশপাশের মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। Nidan Centre-এ তিনি যে যত্ন ও ভালোবাসা পাচ্ছেন, সে কথাই তুলে ধরেছেন। বলেছেন, সেখানে তাঁর বাড়ি থেকে দূরে থাকার অনুভূতি হচ্ছে না।তাঁর কথাবার্তায় অসুবিধা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও, তাঁর বার্তায় হার মেনে নেওয়ার সুর নেই। বরং যতটা সম্ভব ইতিবাচক থাকার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।এটাই হয়তো বিনোদ কাম্বলির গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।একসময় ব্যাট হাতে যিনি প্রতিকূল বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়েছেন, আজ জীবনের অন্য এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি তিনি। কাম্বলির গল্প যেন আগামী প্রজন্মের আয়না : কাম্বলিকে দেখে শুধুমাত্র আফসোস করার কিছু নেই। বরং তাঁর ক্রিকেটজীবন এবং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে প্রশ্ন তোলা যায় নিজেদের নিয়েই।সাফল্য পেলে কি আমরা আরও বেশি দায়িত্বশীল হচ্ছি?প্রশংসা পেলে কি আমরা নিজেদের লক্ষ্যে আরও স্থির থাকছি?আর সবচেয়ে বড় কথা—প্রতিভাকে কি আমরা নিয়মিত পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে ধরে রাখতে পারছি?কাম্বলির জীবন আমাদের কোনও সরল ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’ মানুষের গল্প দেয় না। বরং দেয় একজন অসাধারণ প্রতিভাবান ক্রিকেটারের অসম্পূর্ণ কেরিয়ার এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার ছবি।একসময় যে ব্যাটসম্যানকে ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটে এত স্বপ্ন ছিল, আজ তাঁর জন্য ক্রিকেটপ্রেমীদের একটাই প্রার্থনা—সুস্থ থাকুন বিনোদ কাম্বলি।কারণ রেকর্ডের বাইরেও একজন ক্রিকেটারের জীবনে থাকে মানুষটি নিজে। আর সেই মানুষটির লড়াইকে সম্মান করাটাই আজ সবচেয়ে জরুরি।