পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানালেন ভারতীয় ফুল-ব্যাক প্রবীর দাস
নিজস্ব সংবাদদাতা: স্নায়ুর সমস্যা, মাত্র ৩২ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানালেন পরিচিত ফুটবলার তথা মোহনবাগানের প্রাক্তন রাইট-ব্যাক প্রবীর দাস। একই সঙ্গে তিনি একজন ফুল-ব্যাকও। মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তিন পাতার একটি আবেগঘন খোলা চিঠি প্রকাশ করে সব ধরনের পেশাদার ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান তিনি। ১৪ বছরের ফুটবল কেরিয়ারে ভারতের একাধিক সফল ক্লাবের জার্সি পরেছেন সোদপুরের এই ফুটবলার। তবে তাঁর ফুটবল জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে মোহনবাগান।ছোট বয়সেই পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন প্রবীর। তাঁর ফুটবলযাত্রার শুরু SAIL Academy-তে। ২০১২ সালে পৈলান অ্যারোজ়ের হয়ে সিনিয়র ফুটবলে পা রাখেন তিনি। এরপর ডেম্পো, এফসি গোয়া ও দিল্লি ডায়নামোসের মতো ক্লাবে খেলার পর ২০১৫ সালে কলকাতায় ফিরে সবুজ-মেরুন শিবিরে যোগ দেন।
মোহনবাগানে তিন মরশুম কাটিয়ে দ্রুতই সমর্থকদের অন্যতম প্রিয় ফুটবলার হয়ে ওঠেন প্রবীর। ২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সবুজ-মেরুন জার্সিতে ২৬টি ম্যাচ খেলে একটি গোল করেন তিনি। সেই সময় মোহনবাগানের হয়ে আই লিগ ও ফেডারেশন কাপ জয়ের স্বাদও পান। তাঁর দুরন্ত গতি, আক্রমণে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে সমর্থকদের কাছে বিশেষ জায়গা করে দেয়।
এরপর প্রবীরের কেরিয়ারে আসে নতুন অধ্যায়। ATK-র হয়ে খেলেন তিনি এবং কলকাতার ক্লাবটির হয়ে দু’বার ISL জয়ের অংশীদার হন। ২০২০ সালে ATK ও মোহনবাগানের সংযুক্তির পরও সবুজ-মেরুন শিবিরে থেকে যান তিনি। ২০২২ পর্যন্ত মোহনবাগানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রবীর। এই সময় বহু ম্যাচে তাঁর তৈরি করা সুযোগ থেকে গোল করেছেন ফিজির তারকা রয় কৃষ্ণা। দুই ফুটবলারের মাঠের বোঝাপড়াও সমর্থকদের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল।পরবর্তী সময়ে বেঙ্গালুরু এফসি, কেরালা ব্লাস্টার্স, মুম্বই সিটি-সহ একাধিক ক্লাবে খেলেছেন প্রবীর। বেঙ্গালুরুর হয়ে ডুরান্ড কাপ জয়েরও স্বাদ রয়েছে তাঁর। ২০২৫ সালে কেরালা ব্লাস্টার্স থেকে লোনে মুম্বই সিটিতে যান। পরে যোগ দেন ইন্টার কাশিতে। সেই জার্সি পরেই শেষ পর্যন্ত পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানালেন তিনি।
ভারতের বয়সভিত্তিক দলেও প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রবীর। অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২৩ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অন্যতম পরিচিত ভারতীয় রাইট-ব্যাকদের মধ্যে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন।তবে কেরিয়ারের শেষ দিকে চোট ও শারীরিক সমস্যাই তাঁর পথ কঠিন করে দেয়। নিজের অবসরবার্তায় সেই কঠিন সময়ের কথাও তুলে ধরেছেন প্রবীর। কেরালা ব্লাস্টার্সের প্রি-সিজনে আচমকা বাঁ দিকে অসাড়তা অনুভব করার কথা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, পরে জানতে পারেন সেটি স্নায়ুর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই সময় তাঁর কাছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।অবসর ঘোষণা করতে গিয়ে প্রবীর লিখেছেন, “আজ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আমি পেশাদার ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা করছি।”
তাঁর বিদায়ী বার্তায় বারবার ফিরে এসেছে মোহনবাগানের প্রসঙ্গ। সবুজ-মেরুন ক্লাবের প্রতি নিজের আবেগের কথা জানিয়ে প্রবীর বলেছেন, “এই ক্লাব সবসময় আমার মাদার ক্লাব হয়ে থাকবে। মোহনবাগান আমার মায়ের সমান। এখানেই একজন ফুটবলার হিসেবে আমি নিজের আসল পরিচয় খুঁজে পেয়েছি।”
স্ত্রী গীতশ্রী, তাঁর হয়ে কাজ করা বিভিন্ন ক্লাব, কোচ, সতীর্থ এবং সমর্থকদেরও দীর্ঘ বার্তায় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রবীর। মোহনবাগান জার্সি পরা একটি ছবি শেয়ার করে নিজের ফুটবলজীবনের অন্যতম প্রিয় অধ্যায়কে স্মরণ করেছেন তিনি।সোদপুর থেকে উঠে এসে জাতীয় দলের বয়সভিত্তিক স্তর, আই লিগ, ISL, ডুরান্ড কাপ—ভারতীয় ফুটবলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে খেলেছেন প্রবীর দাস। ১৪ বছরের সেই দীর্ঘ যাত্রার পর ৩২ বছর বয়সে তাঁর বুটজোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্তে শেষ হল এক পরিচিত ফুটবল অধ্যায়।