খড়গপুরের স্বপ্নের অডিটোরিয়াম এখন মরিচাধরা কঙ্কাল, কবে পূরণ হবে সাংস্কৃতিক শহরের আশা?
অপূর্ব মজুমদার : খড়গপুরবাসীর বহু প্রতীক্ষিত অডিটোরিয়াম প্রকল্প আজ কার্যত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee খড়গপুরকে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম উপহার দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণার দুই বছর পর, ২০২২ সালের ২০ অক্টোবর বিদ্যাসাগর আবাসনে প্রস্তাবিত প্রেক্ষাগৃহ ‘বিদ্যাসাগর ভবন’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন পুরপ্রধান প্রদীপ সরকারের উদ্যোগে হওয়া সেই অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত অনাড়ম্বর—রাজনৈতিক দল, বইমেলা কমিটি কিংবা সাংস্কৃতিক জগতের প্রতিনিধিদের কাউকেই সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।সংক্ষিপ্ত সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শেখ হানিফ, জহর পাল, তপন প্রধান, চন্দন সিং-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি। প্রকল্পের বাস্তুকার অম্লান কুমার বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, Macarav Infrastructures India Pvt Ltd এই অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকবে। প্রাথমিকভাবে বাজেট ধরা হয়েছিল ৫ কোটি টাকা, যদিও পরবর্তীতে তা বেড়ে ১০ থেকে ১২ কোটির মধ্যে পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হয়। পরিকল্পনা ছিল প্রায় ১৬ হাজার বর্গফুটের একটি আধুনিক হল, যেখানে একসঙ্গে ৬৫০ জন দর্শক বসতে পারবেন। নির্মাণ শেষ করার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ মাস।কিন্তু বাস্তব ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতদিনে শুধুমাত্র ভিতের কাজই শেষ হয়েছে। নির্মাণস্থলে আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোহার রড, রোদ-বৃষ্টি-জলে যেগুলোয় ধরেছে মোটা মরিচা। একসময়ের স্বপ্নের প্রেক্ষাগৃহ এখন যেন পরিণত হয়েছে অবহেলার প্রতীকে।এরই মধ্যে রাজনৈতিক পালাবদলেও বদলেছে পরিস্থিতি। তৃণমূল কাউন্সিলরদের সিদ্ধান্তে পুরপ্রধানের পদ হারান প্রদীপ সরকার। নতুন পুরপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন কল্যাণী ঘোষ। অভিযোগ, রাজ্য সরকার থেকে বিপুল অর্থ বরাদ্দ এলেও পৌরসভা সেই অর্থ সঠিকভাবে পরিষেবা ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। একাধিক মহল থেকে অভিযোগ ও চিঠি যাওয়ার পর রাজ্য সরকার পৌরসভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বাম ও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে মামলা হলে আদালত সেই নির্দেশ খারিজ করে দেয়। গণতান্ত্রিক কাঠামো ফিরলেও, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনও দৃশ্যমান পদক্ষেপ হয়নি।এদিকে শহরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ক্ষোভ বাড়ছে। খড়গপুরের শিল্পী মহল ইতিমধ্যেই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের দাবিতে সরব হয়েছে। তারা পুরপ্রধান, মহকুমা শাসকের কাছে ডেপুটেশন জমা দিয়েছেন, এমনকি অতিরিক্ত জেলা শাসকের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। তবুও এখনো পর্যন্ত পুরসভার তরফে দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি।খড়গপুরের সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য অত্যন্ত জরুরি এই অডিটোরিয়াম কবে বাস্তবের রূপ পাবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। আপাতত মরিচাধরা লোহার কাঠামোই যেন শহরবাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু কাজ থমকে আছে সময়ের গহ্বরে।