প্রয়াত মুকুল রায়! অন্তরালের রণকৌশলীর অধ্যায়ের অবসান...

নিজস্ব সংবাদদাতা: প্রয়াত প্রবীন নেতা মুকুল রায়। উল্লেখ্য, দীর্ঘ দিন ধরেই শারীরিক সমস্যা নিয়ে সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। রবিবার গভীর রাতে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালীন বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।তাঁর প্রয়াণে রাজনৈতিক মহলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কেউ তাঁকে বলতেন ‘চাণক্য’, কেউ আবার ‘তৃণমূলের অনিল বিশ্বাস’। সংগঠন গড়ার নেপথ্য কারিগর হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করলেও, ব্যক্তিগত কপালের ফেরে এক সময় দেশের রেলমন্ত্রী হওয়া এবং জীবনের শেষ পর্বে বিধায়ক হওয়া — এই দুই পরিচয়ের বাইরে জনতার সামনে তাঁর আলাদা কোনও ‘নায়কোচিত’ অধ্যায় গড়ে ওঠেনি। অবশেষে একদা বঙ্গ রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র মুকুল রায়-এর জীবনাবসান হল। ১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের কাঁচরাপাড়ায় জন্ম। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মুকুল রায়ের ছাত্রজীবন কেটেছে কাঁচরাপাড়া হার্নেট হাই স্কুল এবং নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজে।

সত্তরের দশকে বাম আন্দোলনের ঢেউয়ে ছাত্রজীবনে যুক্ত হয়েছিলেন এসএফআইয়ের সঙ্গে। পরে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের কংগ্রেস নেতা মৃণাল ওরফে আবু সিংহরায়ের হাত ধরে কংগ্রেসে প্রবেশ। সেই সময়ের প্রভাবশালী নেতা সোমেন মিত্র-এর শিবিরে থেকেও বড় কোনও উত্থান হয়নি তাঁর। রাজনীতির প্রকৃত মোড় ঘোরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সান্নিধ্যে এসে। নব্বইয়ের দশকে তাঁর ছাতার তলায় এসে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের ‘বিশ্বস্ত’ সংগঠক।

১৯৯৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় নতুন দলের প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হন মুকুল রায়। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় মমতার পাশে থেকে সংগঠনের ভিত মজবুত করেন তিনি। ২০০৯ সালে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট গঠনের নেপথ্য আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেন। পরে দীনেশ ত্রিবেদীর ইস্তফার পর রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও, মমতার ইউপিএ ছাড়ার সিদ্ধান্তে সেই অধ্যায় দ্রুতই শেষ হয়। দলের অন্দরে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচিতি ছিল ‘দল ভাঙানোর রাজনীতি’র কুশলী হিসেবে। একের পর এক বিরোধী নেতাকে তৃণমূলে টেনে এনে সংগঠন বিস্তারের কৌশল প্রয়োগ করেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কৌশলই হয়ে ওঠে বিতর্কের কারণ। দলের অভ্যন্তরে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে শুরু করলে প্রভাব কমে তাঁর। শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে তৃণমূল ছেড়ে যোগ দেন ভারতীয় জনতা পার্টি-তে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জিতলেও, ভোটের পর ফের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দ্বন্দ্বময় অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে থাকে। শেষ জীবনে অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত ক্ষতিতে ভেঙে পড়েন মুকুল রায়। বিধায়ক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে না পারা, দলের ভেতরে পুরনো প্রভাব হারানো—সব মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির মূল স্রোত থেকে সরে যান। বঙ্গ রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে অন্তরালের এই রণকৌশলী আজ ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নিলেন।