চৈত্র নবরাত্রি তথা বাসন্তী পুজো: জানুন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও প্রয়োজনীয় তথ্য!
নিজস্ব সংবাদদাতা : শুরু হচ্ছে চৈত্র নবরাত্রি তথা বাসন্তী পুজো। জেনে নিন নবরাত্রির কিছু প্রয়োজনীয় বিষয়। বাসন্তী পুজোই কি আদি দুর্গাপুজো? রাজা সুরথ কীভাবে এই পুজোর সূচনা করেন চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে নবমী তিথি পর্যন্ত চলে দেবী বাসন্তীর আরাধনা। শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য অকালে দেবীকে আহ্বান করার আগে পর্যন্ত এই বাসন্তী পুজোই ছিল দেবী দুর্গার প্রধান উৎসব। কিন্তু কে ছিলেন এই বাসন্তী দেবী এবং কেনই বা তাঁর পুজো শুরু হয়েছিল? চৈত্র নবরাত্রি-র সময়কে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে থাকে বিশেষ আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস। এই পবিত্র দিনগুলোতে কিছু নিয়ম মেনে চললে জীবনে ইতিবাচক শক্তির প্রবাহ বাড়ে বলেই বিশ্বাস করা হয়। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলি—
করণীয় : নবরাত্রির দিনগুলোতে নিজের ঘর, বিশেষ করে পূজার স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি। এতে ইতিবাচক শক্তি প্রবেশ করে বলে মনে করা হয়।
প্রতিদিন নিয়ম করে প্রার্থনা করা এবং প্রদীপ জ্বালানো পবিত্র পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করে। তাজা ফুল ব্যবহার করলে চারপাশের পরিবেশ আরও স্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠে।
অনেকে এই সময় পূর্ণ বা আংশিক উপবাস পালন করেন—যা আত্ম-শৃঙ্খলা গড়ে তোলার পাশাপাশি মন ও চিন্তাকে শুদ্ধ করতে সহায়ক। দিনের শুরু একটি ছোট প্রার্থনা দিয়ে করলে মন ইতিবাচক থাকে। ধূপ বা কর্পূর জ্বালিয়ে পরিবেশ শুদ্ধ রাখা এবং মৃদু ভক্তিগীতি বাজানো মানসিক শান্তি এনে দেয়। সবশেষে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও আত্ম-সমালোচনার জন্য কিছুটা সময় রাখাও এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন—যা আধ্যাত্মিক সংযোগকে আরও গভীর করে।
বর্জনীয় : নবরাত্রির সময় রাগ, ঈর্ষা বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কঠোর বা আঘাতমূলক কথা বলা এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এটি মানসিক শান্তিকে ব্যাহত করে। এই পবিত্র সময়ে মদ্যপান ও আমিষ খাবার পরিহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুযায়ী, চুল বা নখ কাটার মতো কাজ থেকেও বিরত থাকেন অনেকেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শুধু আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেই হবে না, নিজের মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। মনকে শান্ত ও ইতিবাচক রাখা এই সময়ের মূল মন্ত্র।
বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যখন নবযৌবন লাভ করে, তখনই মর্ত্যে মর্ত্যে বেজে ওঠে শক্তির আবাহন—বাসন্তী পুজো। বাঙালি তথা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা বলতেই এখন আমরা ‘শারদীয়া’ উৎসবকে বুঝি, কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী আদিতে দেবী দুর্গার আরাধনা হতো বসন্তকালেই। তাই বাসন্তী দেবী মূলত দেবী দুর্গারই আদি রূপ। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে নবমী তিথি পর্যন্ত চলে দেবী বাসন্তীর আরাধনা। শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য অকালে দেবীকে আহ্বান করার আগে পর্যন্ত এই বাসন্তী পুজোই ছিল দেবী দুর্গার প্রধান উৎসব। কিন্তু কে ছিলেন এই বাসন্তী দেবী এবং কেনই বা তাঁর পুজো শুরু হয়েছিল?
আদি ইতিহাস: রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের কাহিনি শ্রী শ্রী চণ্ডী এবং ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’ অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে চিত্রবংশীয় রাজা সুরথ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক। কিন্তু যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এবং নিজের মন্ত্রীদের ষড়যন্ত্রে তিনি রাজ্য হারান। মনের দুঃখে বনে বিচরণ করার সময় তাঁর দেখা হয় সমাধি নামক এক বৈশ্যের সঙ্গে। তাঁরা দুজনেই মহর্ষি মেধার আশ্রমে আশ্রয় নেন। মহর্ষি মেধার উপদেশে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য নদীর তীরে মা দুর্গার মাটির মূর্তি গড়ে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। বসন্তকালে তাঁরা এই পূজা করেছিলেন বলে এর নাম হয় ‘বাসন্তী পুজো’। কথিত আছে, দেবীর আশীর্বাদেই রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পান এবং বৈশ্য লাভ করেন পরম জ্ঞান। সেই থেকে মর্ত্যে বাসন্তী পুজোর প্রচলন শুরু হয়। ভারতীয় পুরাণের দৃষ্টিতে বাসন্তী দেবী: পুরাণ মতে, বাসন্তী দেবী হলেন জগতের আদিশক্তি। তিনি বসন্তের সজীবতা ও সৃষ্টির প্রতীক। শারদীয়া দুর্গাপূজা যেখানে অকালবোধন বা অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক, সেখানে বাসন্তী পুজো হলো ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে জাগতিক সমৃদ্ধি এবং মানসিক শান্তি কামনার উৎসব। দেবী এখানে তাঁর পূর্ণ অলঙ্কারে এবং সৌম্য মূর্তিতে পূজিতা হন।
জ্যোতিষশাস্ত্র: চৈত্র মাসে যখন সূর্য মীন রাশি থেকে মেষ রাশিতে গমন করে, তখন প্রকৃতির এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে। জ্যোতিষ মতে, এই সময়টি শক্তির আরাধনার জন্য শ্রেষ্ঠ। বাসন্তী দেবীর পুজো করলে কুণ্ডলীতে অশুভ গ্রহের প্রভাব কমে এবং মন ও শরীরের রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। বিশেষ করে যাঁদের জীবনে মানসিক অস্থিরতা রয়েছে, তাঁদের জন্য এই পুজো অত্যন্ত ফলদায়ক।
শক্তিবাদ: শাক্ত দর্শনে বাসন্তী দেবী হলেন ব্রহ্মাণ্ডের চালিকা শক্তি। তিনি যেমন অসুরবিনাশিনী, তেমনই তিনি করুণাময়ী জননী। শক্তিবাদ অনুযায়ী, বসন্তকালে এই আরাধনা মানুষের ভেতরের ‘তামসিক’ প্রবৃত্তি জয় করে ‘সাত্ত্বিক’ ভাব জাগ্রত করতে সাহায্য করে।
বাসন্তী পুজোর তাৎপর্য: বর্তমান যুগে শারদীয়া দুর্গোৎসবের জৌলুস অনেক বেশি হলেও, সাবেকি এবং ঐতিহ্যবাহী বহু পরিবার ও মঠে আজও বাসন্তী পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়। এই পুজো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিনাশ নয় বরং সৃষ্টি এবং স্থিতির জন্যই ঈশ্বরের আরাধনা করা প্রয়োজন। বসন্তের নির্মল বাতাসে দেবীর আগমণী বার্তা মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। কথিত আছে শারদ নবরাত্রির মতোই চৈত্র নবরাত্রিতেও মায়ের গমনাগমনের আলাদা বাহন রয়েছে।