শিক্ষার ‘ডাক্তার’ জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়: বাংলার উচ্চশিক্ষার সামনে চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশার নতুন অধ্যায়!
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এই লেখায় উত্থাপিত প্রশ্ন, উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণগুলি কোনও সরকারি অবস্থান বা শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত মতামত নয়। একজন ছাত্র, লেখক এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে বাংলার বর্তমান শিক্ষা-বাস্তবতাকে সামনে রেখে কিছু ভাবনা ও প্রত্যাশার কথাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন বীরভূমের সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি অভিজ্ঞ হলেও শিক্ষা দপ্তরের কর্ণধার হিসেবে তাঁর সামনে রয়েছে এক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি শুনে মনে হয়েছে, দীর্ঘদিনের নানা সমস্যায় জর্জরিত বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা যেন একজন দক্ষ চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকা এক অসুস্থ রোগী। সেই অর্থেই তাঁকে প্রতীকীভাবে ‘শিক্ষার ডাক্তার’ বলা যেতে পারে।বাংলা আজও তার শিক্ষা-ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মানবিকতা, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দূরদৃষ্টি এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুক্ত শিক্ষার দর্শন আমাদের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অব্যবস্থা, অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অসঙ্গতির কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার শরীরে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। রোগী এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু সুস্থ নয়।এই অসুস্থতার অন্যতম লক্ষণ শিক্ষা ও রাজনীতির ক্রমবর্ধমান মিশ্রণ। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু যখন কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার একাডেমিক সাফল্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংঘাত ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জন্য বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জ্ঞানের ক্ষেত্র যদি ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ছাত্রসমাজের।আরেকটি বড় সমস্যা শিক্ষক সংকট। একটি শ্রেণিকক্ষে খালি পড়ে থাকা শিক্ষকের চেয়ার কেবল একটি পদ শূন্য থাকার ইঙ্গিত নয়; এটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও শূন্য হয়ে যাওয়ার প্রতীক। শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ করেন। অথচ রাজ্যের বহু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী শিক্ষকের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে বহু যোগ্য গবেষক ও শিক্ষিত যুবক চাকরির অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাচ্ছেন।গবেষণার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কখনও শুধুমাত্র ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান হতে পারে না; এটি নতুন জ্ঞান, নতুন চিন্তা এবং নতুন সম্ভাবনার জন্মভূমি। কিন্তু অর্থের অভাব, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বহু গবেষক প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছেন। ফলে রাজ্যের বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী ও গবেষক উন্নত সুযোগের খোঁজে অন্য রাজ্য কিংবা বিদেশমুখী হচ্ছেন।এছাড়াও ডিগ্রি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব একটি বড় সামাজিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষাঙ্গন ছাড়ছেন, কিন্তু কর্মজীবনের বাস্তবতায় প্রবেশের সময় তাঁদের সামনে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তার প্রাচীর। শিক্ষা কেবল চাকরির জন্য নয়, কিন্তু শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনের চাহিদা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষয় হতে শুরু করে।এই প্রেক্ষাপটে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একজন প্রকৃত চিকিৎসক শুধু ওষুধ দেন না; তিনি রোগের মূল কারণ শনাক্ত করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষাকে জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি তিনি তুলে ধরেছেন, তা আশাব্যঞ্জক। শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং জাতীয় শিক্ষা নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের উপর তাঁর গুরুত্বারোপও ইতিবাচক বার্তা বহন করে।তবে আমাদের বিশ্বাস, বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট অবকাঠামো বা অর্থের অভাব নয়; সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশ্বাসের সংকট। ছাত্রছাত্রীরা প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা হারাচ্ছে, শিক্ষকরা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছেন, অভিভাবকেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। অথচ শিক্ষা কেবল পেশা গঠনের উপায় নয়; শিক্ষা একটি সমাজের চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়ের নির্মাতা।তাই নতুন শিক্ষামন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন ভবন নির্মাণ বা নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আবারও জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং মেধার বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।আমাদের এই বক্তব্য সমালোচনা নয়; এটি প্রত্যাশা। কারণ আমি এখনও বিশ্বাস করি, বাংলার শিক্ষা মৃত নয়। সে আহত, ক্লান্ত এবং বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু এখনও জীবিত। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ও আশুতোষের বাংলা কখনও সম্পূর্ণভাবে জ্ঞানের আলো হারিয়ে ফেলতে পারে না। তবে সেই আলো জ্বালিয়ে রাখতে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, সাহস এবং সঠিক নেতৃত্ব।ইতিহাসই একদিন বিচার করবে, জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় সত্যিই বাংলার শিক্ষার ‘ডাক্তার’ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন কি না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, প্রকৃত চিকিৎসক তিনি নন যিনি রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন; প্রকৃত চিকিৎসক তিনি, যিনি সমস্যাকে স্বীকার করেন, রোগীর যন্ত্রণা উপলব্ধি করেন এবং প্রয়োজন হলে কঠিন চিকিৎসার পথ বেছে নিতে পিছপা হন না।আজ বাংলার শিক্ষা সেই চিকিৎসকের অপেক্ষায়। কারণ এই দায়িত্ব শুধু একটি মন্ত্রকের নয়; এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের বৌদ্ধিক মর্যাদা এবং বাংলার শিক্ষার গৌরবময় ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব। — দেবরাজ সাহা (তরুণ লেখক, গল্পকার এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক)