Breaking news : মধ্যরাতে লোকসভায় পাশ ঐতিহাসিক ওয়াকফ বিল!
নিজস্ব প্রতিবেদন : ১২ ঘণ্টা টানা বিতর্কের পরে রাত ২ টোয় লোকসভায় পাশ ওয়াকফ বিল।লোকসভায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছে বিতর্ক। খাতায় কলমে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ তখন ৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার। আর সেই বৃহস্পতির রাত ২ টোয় লোকসভায় পাশ হয়েছে ওয়াকফ সংশোধনী বিল। এই বিল পাশের আগে লোকসভায় এক তুমুল ডিবেট দেখা যায়। ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল পাশের ক্ষেত্রে লোকসভায় পক্ষে ভোট পড়েছে ২৮৮টি। আর বিপক্ষে পড়েছে ২৩২ ভোট। মধ্যরাত পার করে চলা এই দীর্ঘ ডিবেটে কার্যত শাসকপক্ষকে ভোটে কাঁটে কি টক্কর দিয়েছে বিরোধীরা।
ওয়াকফ কী?
ওয়াকফ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ স্থগিত করা, আবদ্ধ করা, স্থির রাখা, নিবৃত্ত রাখা। ওয়াকফ ইসলামি শরিয়তের একটি বিশেষ পরিভাষা। কোনও সম্পত্তির মালিক নিজের মালিকানা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সম্পত্তি ঘোষণা করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জনকল্যাণ বা জনসেবার জন্য উৎসর্গ করলে সেই উৎসর্গ করার কাজটিকে ‘ওয়াকফ’ বলা হয়।১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের মুসলমান ওয়াকফ বৈধকরণ আইনে প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ওয়াকফ অর্থ কোনও মুসলমান কর্তৃক তার সম্পত্তির কোনও অংশ এমন কাজের জন্য স্থায়ীভাবে দান করা, যা মুসলিম আইনে ‘ধর্মীয়, পবিত্র বা সেবামূলক’ হিসেবে স্বীকৃত।এক কথায়, ওয়াকফ সম্পত্তি হল সেই সমস্ত স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি, যা দলিলের মাধ্যমে আল্লাহর নামে করে দেওয়া হয়। নথিপত্রের যুগ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে এই পদ্ধতি প্রচলিত আছে।সাধারণত কোনও জনকল্যাণ মূলক কাজে ব্যবহৃত হয় এই জমি। অথবা কেউ উত্তরসূরী হিসেবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। এই সম্পত্তি কখনও হস্তান্তর করা যায় না। সাধারণত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কবর, মসজিদের জন্য, গরিব মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য জমি ব্যবহার করা হয়। ওয়াকফ সম্পত্তি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা দান করা হয় এবং বোর্ডের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রতিটি রাজ্যের একটি ওয়াকফ বোর্ড আছে।
ওয়াকফ বোর্ড কী?
ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য আলাদা বোর্ড বা কমিটি গড়ার ধারণা ভারতে শুরু হয় সেই সুলতানি আমল থেকে। দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই ওয়াকফ বোর্ডের ধারণা তৈরি হয়। এই বোর্ডের মূল কাজ ওয়াকফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করা। স্বাধীন ভারতে ১৯৫৪ সালে পাশ হয় ওয়াকফ আইন। ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ আইন সংশোধন করে, ওয়াকফ বোর্ডকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালেও একবার ওয়াকফ আইন সংশোধন করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ওয়াকফ বোর্ডের সারা দেশে ৮.৭ লক্ষেরও বেশি সম্পত্তি রয়েছে, যা ৯.৪ লক্ষ একর জুড়ে বিস্তৃত। রেল এবং ভারতীয় সেনার পর দেশে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি রয়েছে ওয়াকফ বোর্ডেরই।
নয়া ওয়াকফ সংশোধনী বিলে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছে?
ওয়াকফ বিলের ৪০ নম্বর ধারা আইন অনুযায়ী, ওয়াকফ বোর্ডের দখল করা সম্পত্তি বা জমিতে সরকার কোনও রকম হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কোনও রকম পর্যালোচনা ছাড়াই ওয়াকফ বোর্ড জমি দখল করতে পারে। কোনও সম্পত্তি নিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ওয়াকফ বোর্ডের আইনি বিবাদ চললেও তাতেও হস্তক্ষেপ করতে পারে না সরকার। সরকার সংশোধিত ওয়াকফ আইনে মূলত ওয়াকফ অধিকার খর্ব করতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিতর্কিত কোনও সম্পত্তির মালিকানা আদতে কার, তাও খতিয়ে দেখার আইনি এক্তিয়ার সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে বলে সরব বিরোধীরা। নতুন সংশোধনী বিলে ওয়াকফ বোর্ডের একচ্ছত্র অধিকার সরকার কেড়ে নিতে চাইছে বলে অনেকেই মনে করছেন। কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ কিনা, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে জেলাশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনও আধিকারিককে। নতুন বিলে ওয়াকফ বোর্ডে দুই অমুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির নথিভুক্তিকরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুরনো আইনে কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ সম্পত্তি ঘোষণা করলে, তা চিরদিনের জন্য ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবেই থেকে যেত। নতুন বিলে এবার থেকে সেটাকেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে। ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে ইসলামিক ধর্মস্থান বা অন্য কোনও ইসলামিক প্রার্থনাস্থল তৈরি হলেও এবার থেকে সেটাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে দাবি করা যেতে পারে।
ওয়াকফ সংশোধন কেন করা হচ্ছে?
সরকারের যুক্তি, বর্তমান আইন অনুযায়ী, ওয়াকফের দখল করা জমি বা সম্পত্তি কোনও ভাবেই পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকে না। কারও আপত্তি সত্ত্বেও জমি বা সম্পত্তি দখল করতে পারে ওয়াকফ বোর্ড। গেরুয়া শিবিরের দাবি, ওয়াকফ সম্পত্তির সমস্ত সুবিধা ভোগ করছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মুসলিমরা। নতুন আইনে সাধারণ মুসলিমরা উপকৃত হবেন। সাচার কমিটির রিপোর্টেও ওয়াকফ নিয়মের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল
ওয়াকফ কত প্রকার?
ওয়াকফ মূলত তিন প্রকার ১) ওয়াকফ ফি লিল্লাহ,
২) ওয়াকফ আলাল আওলাদ (অর্থাৎ ব্যক্তিগত ওয়াকফ) ৩) মিশ্র ওয়াকফ।
– কেবল ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে সৃষ্ট ওয়াকফকে বলা হয় ওয়াকফ ফি লিল্লাহ।
– উৎসর্গকারীর নিজের কিংবা পরিবার বা বংশধরদের ভরণপোষণ বা উপকারার্থে ওয়াকফ করা হলে তাকে বলা হয় ওয়াকফ আলাল আওলাদ।
– আর মিশ্র ওয়াকফে ধর্মীয় ও দাতব্য প্রকৃতির সর্বজনীন উদ্দেশ্য এবং উৎসর্গকারীর পরিবার বা বংশধরদের উপকার দুটি বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিরোধিতার কারণ কী?
সংখ্যালঘুদের একাংশের ধারণা, এই বিল পাশ হয়ে গেলে ইসলামিক সম্পত্তি সরকার হস্তগত করবে। এই বিল ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের স্বত্ত্বায় আঘাত করবে বলে মনে করছেন বিরোধীরা। ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিমদের প্রবেশ নিয়ে প্রবল আপত্তি রয়েছে বিরোধী শিবিরের। একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে টার্গেট করার জন্য এই বিল সংশোধন করা হচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।