নীল ষষ্ঠী ও মা তারা: শিবের ত্যাগ, মাতৃস্নেহ আর সন্তানের মঙ্গলের এক অনন্য ব্রতকথা!
‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’— বাংলা সাহিত্যের এই চিরন্তন প্রার্থনাই যেন প্রাণ পায় নীল ষষ্ঠীর ব্রতে। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন বাংলার হিন্দু মায়েরা সন্তানের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনায় গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করেন। তবে এই ব্রতের অন্তরে জড়িয়ে আছে মহাদেবের ত্যাগ এবং মা তারার অসীম মাতৃস্নেহের এক গভীর পৌরাণিক কাহিনি। নীল ষষ্ঠী ও মা তারার পৌরাণিক কাহিনি : পুরাণ মতে, সমুদ্র মন্থনের সময় ভয়ংকর হলাহল বিষের উৎপত্তি হয়। সেই বিষের প্রভাবে দেবতা, অসুর থেকে শুরু করে সমগ্র সৃষ্টিজগত ধ্বংসের মুখে পড়ে। তখন সকলেই আশ্রয় নেন ভোলেনাথ মহাদেবের কাছে।সৃষ্টিকে রক্ষা করতে মহাদেব করুণাবশত সেই ভয়ংকর বিষ পান করেন। বিষ গলায় ধারণ করতেই তাঁর কণ্ঠ নীলবর্ণ ধারণ করে, আর সেই থেকেই তিনি পরিচিত হন নীলকণ্ঠ শিব নামে।কিন্তু বিষের তীব্র জ্বালায় শিবের সমগ্র শরীর দগ্ধ হতে থাকে। সেই সংকটময় মুহূর্তে আদিশক্তি মাতৃরূপে আবির্ভূত হন মা তারা। তিনি শিবকে নিজের কোলে তুলে নেন, সন্তানের মতো আগলে রাখেন এবং দুধ পান করিয়ে বিষের জ্বালা শান্ত করেন।এই কাহিনি শুধু শিবের ত্যাগকেই নয়, মা তারার পালনকারী, স্নেহময়ী মাতৃরূপকেও তুলে ধরে। তিনি শুধু শক্তির দেবী নন, তিনি সেই মা—যিনি প্রয়োজনে শিবকেও সন্তানরূপে রক্ষা করেন।
কাহিনির শিক্ষা :
এই ব্রতের মূল বার্তা অত্যন্ত গভীর—
ত্যাগ (শিব) ও করুণা (মা তারা)—এই দুই শক্তির মিলনেই সৃষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে।
নীল ষষ্ঠীর মাহাত্ম্য :
গ্রাম বাংলায় ষষ্ঠী তিথিতে সাধারণত উর্বরাশক্তির দেবী ষষ্ঠী-র পূজার রীতি প্রচলিত। অশোক ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠীর মতোই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্বণ। তবে নীল ষষ্ঠীর বিশেষত্ব হল, এদিন শিবের আরাধনাই মুখ্য, কারণ তিনি নীলকণ্ঠ রূপে সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন।বাংলার বহু জায়গায় এটিকে নীল পুজো বলেও ডাকা হয়।
কেন শিবের পুজো হয়?
আর একটি প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, দক্ষযজ্ঞে সতীর আত্মাহুতির পর তিনি রাজা নীলধ্বজের কন্যা নীলাবতী রূপে পুনর্জন্ম নেন। পরে তাঁর সঙ্গেই মহাদেবের বিবাহ হয়। লোকবিশ্বাস, চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিনই শিব ও নীলাবতীর বিবাহ হয়েছিল। সেই স্মরণেই এদিন শিবের বিশেষ পূজা করা হয়।
ব্রতকথা ও লোকবিশ্বাস :
ব্রতকথায় বলা হয়, এক নিঃসন্তান দম্পতি গভীর ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করে সন্তানসুখ লাভ করেছিলেন। পরে সন্তানের অকালমৃত্যুর আশঙ্কা থেকেও দেবতার কৃপায় মুক্তি মেলে। সেই থেকেই বাংলার মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় এই ব্রত পালন করে আসছেন।
কীভাবে পালন করা হয়
- চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন সারাদিন নির্জলা উপবাস
- সন্ধ্যায় শিবলিঙ্গে জল অর্পণ
- প্রদীপ জ্বালিয়ে শিব ও ষষ্ঠী দেবীর পূজা
- পঞ্চামৃত (দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি) নিবেদন
- প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে উপবাস ভঙ্গ
গ্রাম বাংলার উৎসবের আবহ :
পশ্চিমবঙ্গের বহু স্থানে নীল ষষ্ঠী, চৈত্র সংক্রান্তি ও গাজন একসঙ্গে শিব-পার্বতীর বিবাহোৎসবের আবহে পালিত হয়। কোথাও চরক পুজো ও গাজনের মেলা বসে, যা গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে। সব মিলিয়ে নীল ষষ্ঠী শুধু একটি ধর্মীয় ব্রত নয়, এটি মাতৃত্ব, ত্যাগ, করুণা এবং সন্তানের মঙ্গলকামনার এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রতীক। শিবের আত্মবলিদান আর মা তারার স্নেহময় রূপ এই ব্রতকে বাংলার হৃদয়ে চিরন্তন করে রেখেছে।