দুর্ঘটনায় হারালেন হাত-পা, তবু বিশ্বজয় —পায়েল নাগের অদম্য লড়াই!
নিজস্ব সংবাদদাতা : সমাজ একসময় তাঁকে চিনত ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে। কিন্তু আজ সেই পরিচয়কে ছাপিয়ে গিয়েছে তাঁর লড়াই, জেদ আর অসাধারণ সাফল্য। ওড়িশার বালাঙ্গিরের দিনমজুর পরিবারের মেয়ে পায়েল নাগ এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বর্ণপদকজয়ী প্যারা তিরন্দাজ—এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক সোনা জিতে নিয়েছেন পায়েল। এপ্রিলের শুরুতে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজ়’-এ তিনি হারিয়ে দেন বিশ্বের এক নম্বর প্যারা তিরন্দাজ শীতল দেবী-কে। ১৩৯-১৩৬ পয়েন্টে জিতে স্বর্ণপদক তুলে নিয়ে তিনি কার্যত চমকে দিয়েছেন ক্রীড়ামহলকে। কিন্তু এই সাফল্যের পথ মোটেই সহজ ছিল না। জন্মের পর প্রথম আট বছর পায়েল ছিলেন একেবারে স্বাভাবিক শিশু। কিন্তু আট বছর বয়সে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে জীবনের মোড় ঘুরে যায়। হারাতে হয় দুই হাত ও দুই পা। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় কঠিন লড়াই। অভাবী পরিবারে জন্ম হওয়ায় বাবা-মা বাধ্য হয়েই তাঁকে শিশু আবাসে পাঠান। বালাঙ্গিরের ‘পর্বতগিরি বালনিকেতন’-এ বড় হয়ে ওঠেন পায়েল। সেখানেই তিনি শেখেন—জীবনে হার মানা যাবে না। হাত-পা না থাকলেও থেমে থাকেননি। মুখের সাহায্যে লেখা, ছবি আঁকা—সব কিছুতেই নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করেন।
তিরন্দাজ হওয়ার আগে পায়েল একজন দক্ষ অঙ্কনশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান। জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় তাঁর আঁকা ছবি প্রশংসা কুড়োয়। কিন্তু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি ভিডিও—যেখানে শীতল দেবী-র তিরন্দাজি দেখে অনুপ্রাণিত হন পায়েল। পরে সমাজমাধ্যমে পায়েলের মুখ দিয়ে ছবি আঁকার ভিডিও ভাইরাল হয়। সেই ভিডিও নজরে আসে প্রশিক্ষক কুলদীপ বেদওয়ান-এর। তিনি নিজে গিয়ে পায়েলের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেন কাটরার ‘মাতা বৈষ্ণোদেবী শ্রাইন আর্চারি অ্যাকাডেমি’-তে। তবে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। যেখানে শীতল দেবী পায়ের সাহায্যে তির চালান, সেখানে পায়েলের পা-হাত কোনওটাই নেই। তাই তাঁকে তৈরি করতে হয়েছে নিজের আলাদা কৌশল। মুখ দিয়েই ধনুক স্থির করা এবং তির ছোড়া—এই কঠিন প্রক্রিয়াকেই নিজের দক্ষতায় পরিণত করেছেন তিনি। ক্রমে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় নিজের জায়গা পাকা করেন পায়েল। ২০২৫ সালে ‘ইন্ডিয়া প্যারা গেমস’-এ রুপোর পদক জেতেন। পাশাপাশি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ইয়ুথ প্যারা গেমসেও অংশ নেন। আর তারপরই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোনার সাফল্য—যা তাঁকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
এখন পায়েলের লক্ষ্য আরও বড়। ২০২৬ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। পায়েলের জীবন যেন এক স্পষ্ট বার্তা—শরীরের সীমাবদ্ধতা নয়, আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে মনের মধ্যে। আর সেই মনের জোরেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন ওড়িশার এই লড়াকু কন্যা।