৪০০ বছরের ঐতিহ্যে ভক্তির জোয়ার, জকপুর মনসা মেলায় উপচে পড়ল জনসমুদ্র!
অরিন্দম চক্রবর্তী : ভক্তি, বিশ্বাস ও লোকঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধনে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হলো দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহাসিক জকপুর প্রাচীন মনসা মেলা। ৩১ মার্চ মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুরের জকপুর সংলগ্ন মনসার জঙ্গল এলাকায় শুরু হওয়া এই মহামেলাকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের ঢল নামে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, বহু শতাব্দী ধরে এই জঙ্গল ও সংলগ্ন খালকে ঘিরেই মা মনসার মাহাত্ম্য জড়িয়ে রয়েছে, আর সেই বিশ্বাসের ধারাবাহিকতাতেই প্রতি বছর এই মেলা এক বিশাল ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়।
৩০ মার্চ মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জল সম্পদ বিকাশ মন্ত্রী ডাঃ মানস রঞ্জন ভূঁইয়া। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রদ্যোৎ ঘোষ, নির্মল ঘোষ-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি। এছাড়াও ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি অজিত মাইতি মা মনসার পুজো দিতে এসে মেলার আধ্যাত্মিক আবহকে আরও উজ্জ্বল করে তোলেন।
মইশা ও গোট গেড়িয়া গ্রামের বাসিন্দাদের পরিচালনায় আয়োজিত এই মেলা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম মনসা মেলা হিসেবে পরিচিত। আয়োজকদের দাবি, এ বছর এই ঐতিহ্যবাহী মেলা ৪০০ বছরে পদার্পণ করেছে, যা এলাকাবাসীর কাছে বিশেষ গর্বের বিষয়।
এবারের মেলায় মূল বেদির চারপাশ প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার ফল ও ফুল দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে, আর পিতলের তৈরি মূল বেদি দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।পুজো কমিটির সম্পাদক শ্যামল কুমার বেরা জানান, গোটা আয়োজনের জন্য প্রায় ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এবছর মেলায় ১৫ হাজারেরও বেশি ছোট-বড় দোকান বসেছে, যা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।পুজো কমিটির সভাপতি বারিন কুমার ভূঁইয়া-র দাবি, পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি Bihar, Jharkhand এবং Odisha থেকেও ভক্তরা এসেছেন।
সব মিলিয়ে প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষের সমাগমে এবারের মেলা কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়।মহামেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল সন্ধ্যা সাতটার বর্ণময় আতশবাজির প্রদর্শনী। ১ এপ্রিল দেব লোক অপেরার যাত্রাপালা “আমার মা আমার নয়” দর্শকদের মন জয় করে।
চারদিনব্যাপী এই মহামেলার সমাপ্তি অনুষ্ঠানে ২ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় থাকছে আতশবাজির পাশাপাশি অঙ্কিতা ভট্টাচার্য, অতনু মিশ্র ও রাহুল দেব-এর সংগীত পরিবেশনা। পাশাপাশি বিচিত্রা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জোয়ার ভাটা ধারাবাহিকের অভিনেত্রী আরাত্রিকা মাইতি। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক আবেগ এবং লোকউৎসবের মহিমায় জকপুর মনসা মেলা এবারও প্রমাণ করল— এটি শুধু একটি মেলা নয়, বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস।