ফুটপাতের মানুষ, শহরের বিবেক!
মানুষ কেন ফুটপাতে রাত কাটায়? কেন একটি পরিবার বছরের পর বছর খোলা আকাশের নীচে বসবাস করতে বাধ্য হয়? কেন শীতের রাতে কাঁথা জড়িয়ে, বর্ষায় ছেঁড়া ত্রিপলের নীচে কিংবা গ্রীষ্মের দাবদাহে রাস্তার ধারে জীবন কাটাতে হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু সরকারি নথি, পরিসংখ্যান বা প্রকল্পের তালিকায় খুঁজলে পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল মন—যে মন অন্য মানুষের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে।জ্বালাময় গ্রীষ্ম, থইথই বর্ষা কিংবা হাড়কাঁপানো শীত—ঋতু বদলায়, আবহাওয়া বদলায়, কিন্তু ফুটপাতবাসীদের ঠিকানা বদলায় না। কলকাতার রাজপথ থেকে অলিগলি, ফুটপাতই তাঁদের ঘর, বিছানা, রান্নাঘর, সংসার। সেখানে নেই চার দেওয়ালের নিরাপত্তা, নেই মাথার উপর স্থায়ী ছাদ। দুর্যোগের সময়ে ভরসা বলতে অনেকের কাছে একটি ছেঁড়া ত্রিপল—সেটুকুও সকলের ভাগ্যে জোটে না।পুরসভার উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় নৈশাবাস তৈরি হয়েছে। বিনামূল্যে সেখানে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। তবু বহু মানুষ এখনও ফুটপাতেই রাত কাটান। কেউ জায়গা পান না, কেউ পরিবার নিয়ে যেতে পারেন না, আবার কারও কাছে দীর্ঘদিনের অভ্যাসই হয়ে উঠেছে জীবনের বাস্তবতা। তাই প্রশ্ন থেকে যায়—আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে বলেই কি ফুটপাতবাসীদের দায়িত্ব শেষ?কয়েক বছর আগে লেনিন সরণিতে ঘুমন্ত আট বছরের তৃষা দত্তের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। ফুটপাতেই ঘুমিয়ে ছিল শিশুটি। একটি বেপরোয়া গাড়ি তাকে পিষে দেয়। হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।একটি শিশুর মৃত্যু নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একাধিক ফাঁক। ফুটপাতবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয় আছে কি না, ফুটপাত কতটা নিরাপদ, রাতে সেখানে নজরদারি কেমন, বেপরোয়া গাড়ি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কতটা সক্রিয়—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।দুঃখের বিষয়, সেই ঘটনার পরেও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। বিধান সরণি, যদুনাথ দে রোড, মানিকতলা রোড, হেদুয়া-সহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় এখনও বহু পরিবার ফুটপাতেই বসবাস করছে। কারও জীবনের পাঁচ দশক কেটে গিয়েছে সেই ফুটপাতেই। সেখানেই সন্তান বড় হয়েছে, সেখানেই কেটেছে জীবনের অসংখ্য রাত।রেণু সিংহ কিংবা একাদশী মণ্ডলের মতো মানুষের বক্তব্য আমাদের থমকে দেয়। তাঁরা বলেন, ফুটপাতের জীবনেই তাঁরা অভ্যস্ত। ঠান্ডা, গরম, বৃষ্টিতে কষ্ট হয়, তবু অন্য কোথাও যেতে চান না। মানিকতলার মুস্তাক আহমেদও জানান, ছোটবেলা থেকেই রাস্তায় থাকার অভ্যাস। ছাদের নীচে ঘুমোতে গেলেই অস্বস্তি হয়।কিন্তু এখানেই আমাদের ভাবতে হবে—অভ্যাস কি সবসময় পছন্দের নাম? নাকি অনেক সময় দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বাধ্যতাকেই মানুষ ‘অভ্যাস’ বলে মেনে নেয়?একজন মানুষ ফুটপাতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন বলেই তাঁর নিরাপত্তার অধিকার শেষ হয়ে যায় না। বরং এত বছর ধরে যদি কেউ ফুটপাতেই থেকে থাকেন, তাহলে প্রশাসনের কাছে সেটি আরও বড় দায়িত্বের বিষয় হওয়া উচিত।পুরসভা নৈশাবাস তৈরি করেছে, এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই আশ্রয় মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে কি না, পরিবারগুলির জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আছে কি না—সেগুলিও নিয়মিত খতিয়ে দেখা দরকার। শুধু পরিকাঠামো তৈরি করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না।একইসঙ্গে শহরের রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চলাচল বন্ধ করাও জরুরি। ফুটপাতবাসীদের জীবনকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ ও পুরসভাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলিতে নজরদারি, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাতে গাড়ি ওঠা বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।কারণ ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটি ‘অন্য কেউ’ নন। তিনি এই শহরেরই নাগরিক। তাঁর হয়তো নিজের নামে বাড়ি নেই, কিন্তু তাঁরও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।শীতের রাত নামলে শহরের আলো জ্বলে উঠবে। বহুতলের জানলায় উষ্ণ আলো দেখা যাবে। আর সেই একই শহরের কোনও ফুটপাতে কেউ পুরনো কম্বল জড়িয়ে সন্তানকে বুকে নিয়ে রাত কাটাবেন। এই বৈপরীত্যই আমাদের শহরের সবচেয়ে অস্বস্তিকর আয়না।কোনও এক রাতে যদি আবার কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তখন তদন্ত হবে, ক্ষতিপূরণের কথা উঠবে, কয়েকদিন সংবাদ শিরোনাম হবে। কিন্তু তার আগে যদি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটাই হবে প্রকৃত প্রশাসনিক দায়িত্ব।ফুটপাত কারও ঘর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যতদিন ফুটপাতই কারও ঘর, ততদিন সেই ঘরটুকুকে অন্তত নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের।শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু বহুতল, প্রশস্ত রাস্তা আর ঝলমলে আলো দিয়ে মাপা যায় না। একটি শহর কতটা সভ্য, কতটা মানবিক—তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সেই শহরের ফুটপাতে।ফুটপাতের মানুষদের দিকে তাকানোর সময় তাই দয়ার চোখ নয়, মানুষের চোখে তাকাতে হবে। কারণ একজন মানুষের যন্ত্রণা আরেকজন মানুষই বুঝতে পারে।ফুটপাতবাসীরা শহরের বোঝা নন। তাঁরা শহরেরই মানুষ। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দয়া নয়—এটি দায়িত্ব।