ভারতীয় বিজ্ঞানজগতে নতুন ইতিহাস, অস্কার ক্লেইন পদক পেলেন বাঙালি অশোক সেন!
নিজস্ব সংবাদদাতা: কলকাতায় জন্ম, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা, আর সেখান থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার আন্তর্জাতিক গবেষণার মঞ্চে অনন্য কৃতিত্ব। ভারতীয় বিজ্ঞানজগতে নতুন ইতিহাস গড়লেন বিশিষ্ট পদার্থবিদ অশোক সেন। ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ অস্কার ক্লেইন পদক পেয়েছেন তিনি। এই সম্মান অর্জনকারী প্রথম ভারতীয় পদার্থবিদ অশোক সেনের এই সাফল্য দেশের বিজ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। স্ট্রিং তত্ত্ব, ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি এবং স্ট্রিং ফিল্ড তত্ত্বে তাঁর মৌলিক গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবেই এসেছে এই আন্তর্জাতিক সম্মান। ২২ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবানোভা কেন্দ্রে অস্কার ক্লেইন স্মারক বক্তৃতা দেন অশোক সেন। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘Gravity from Strings and Strings from Gravity’। মহাকর্ষ ও স্ট্রিং তত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এই আলোচনা আধুনিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম গভীর গবেষণার ক্ষেত্রকে সামনে নিয়ে আসে।
কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণার শীর্ষে : ১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই কলকাতায় জন্ম অশোক সেনের। তাঁর বাবা অনিলকুমার সেন ছিলেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। বিজ্ঞানচর্চার আবহে বেড়ে ওঠা অশোকের শিক্ষাজীবনের সূচনা কলকাতাতেই। শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯৭৫ সালে সেখান থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। পরের বছর, ১৯৭৬ সালে, আইআইটি কানপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য পাড়ি দেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং নিউ ইয়র্কের স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি সম্পন্ন করেন।পরবর্তী সময়ে তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন, কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং মহাকর্ষের প্রকৃতি। দীর্ঘদিনের নিরলস গবেষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেন তিনি।
স্ট্রিং তত্ত্বে মৌলিক অবদান : অশোক সেনের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র স্ট্রিং তত্ত্ব। এই তত্ত্বে প্রকৃতির মৌলিক কণাগুলিকে অতি ক্ষুদ্র কম্পনশীল সুতোর মতো কাঠামোর সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। এর একটি প্রধান লক্ষ্য হলো কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা ও মহাকর্ষের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া।এই ক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান এস-ডুয়ালিটি (S-duality)। সহজভাবে বললে, এই ধারণা একটি তত্ত্বের শক্তিশালী পারস্পরিক ক্রিয়াকে অন্য একটি তত্ত্বের দুর্বল পারস্পরিক ক্রিয়ার সাহায্যে বিশ্লেষণ করার পথ দেখায়। স্ট্রিং তত্ত্বের বিভিন্ন গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে গভীর সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি নির্ণয় এবং স্ট্রিং ফিল্ড তত্ত্বেও তাঁর কাজ বিশেষভাবে স্বীকৃত। ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি বলতে তার সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ কোয়ান্টাম অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিমাপকে বোঝায়। এই অবস্থাগুলির সংখ্যা নির্ভুলভাবে গণনা করার ক্ষেত্রে অশোক সেনের গবেষণা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তাঁর এই কাজগুলি আধুনিক স্ট্রিং তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
১৯৮৮ সাল থেকে চালু এই আন্তর্জাতিক সম্মান : সুইডিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অস্কার ক্লেইনের নামাঙ্কিত এই পদক ১৯৮৮ সাল থেকে প্রদান করা হচ্ছে। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্স যৌথভাবে এই সম্মান প্রদান করে। পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া এই পদকের পূর্ববর্তী প্রাপকদের মধ্যে রয়েছেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী চেন-নিং ইয়াং, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ও হান্স বেথে। সেই আন্তর্জাতিক সম্মানের তালিকায় এবার যুক্ত হলো অশোক সেনের নাম। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, তিনিই এই পদকপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় পদার্থবিদ। তাঁর এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক গবেষণাক্ষেত্রে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অবদানের গুরুত্ব আরও একবার তুলে ধরল।
আগেও একাধিক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মান : অস্কার ক্লেইন পদক অশোক সেনের দীর্ঘ সম্মানযাত্রায় নতুন সংযোজন মাত্র। ১৯৮৯ সালে তিনি পান আইসিটিপি পুরস্কার এবং ১৯৯৪ সালে শান্তিস্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কার। ১৯৯৮ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।২০০৯ সালে তিনি পান ইনফোসিস পুরস্কার। ২০১২ সালে স্ট্রিং তত্ত্বের ঐক্যবদ্ধ কাঠামো প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্সের অন্যতম প্রাপক হন। ২০১৩ সালে পান পদ্মভূষণ এবং ২০১৪ সালে ডিরাক পদক। এই ধারাবাহিক স্বীকৃতি তাঁর গবেষণার আন্তর্জাতিক গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
গবেষণার সঙ্গেই যুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম : বর্তমানে অশোক সেন বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেস (ICTS)-এ ইনফোসিস মাধব চেয়ার অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। গবেষণার পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগসূত্র ভারতীয় তাত্ত্বিক বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।আইসিটিএসের অধিকর্তা রাজেশ গোপাকুমার অশোক সেনকে এই সম্মান অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্ট্রিং তত্ত্ব ও মৌলিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। কলকাতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যাত্রা শুরু করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের সারিতে পৌঁছনো অশোক সেনের জীবনপথ নতুন প্রজন্মের গবেষকদের কাছেও অনুপ্রেরণার। তাঁর অস্কার ক্লেইন পদক প্রাপ্তি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ইতিহাসেও একটি স্মরণীয় অধ্যায়।