সাঁওতালি ভাষা, অলচিকি লিপি—দুই কি এক?
সাঁওতালি অলচিকি লবঙ্গ জিলিপি—শৈশবের এক মজার স্মৃতি দিয়েই হয়তো শুরু করা যায়। আমাদের সময়ে ছোটদের হাতে থাকত ‘বঙ্গলিপি’ খাতা। পাতলা মলাটে আঁকা থাকত শীর্ণ বঙ্গজননীর মানচিত্র। মানচিত্রের মাথার দিকে, দার্জিলিং জেলার বাঁ পাশে লেখা থাকত ‘বঙ্গ’, আর কোচবিহারের দিকে, যেখানে অসমের সঙ্গে সীমানা মিলেছে, লেখা থাকত ‘লিপি’। ছোটরা সেই মলাটের ‘বঙ্গ’-কে লবঙ্গ আর ‘লিপি’-কে জিলিপি বানিয়ে বেশ মজা পেত।আমাদের বাড়িতে সুন্দর হস্তাক্ষরের গুরুত্ব ছিল বানান শেখার মতোই। বড় বড়, স্পষ্ট ও সুচারু অক্ষরে দিদিমাকে চিঠি লিখতাম আমরা। মামাদের হাত দিয়ে সেই চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত হয়ে সকলকে নাতি-নাতনিদের লেখা দেখাতেন।সেই সময় থেকেই জানতাম—ভাষা আর লিপি এক জিনিস নয়। বাংলা ভাষা কীভাবে গড়ে উঠেছে, সে ইতিহাস দীর্ঘ। কিন্তু বাংলা লিপির মান্য রূপ তৈরির ক্ষেত্রে পণ্ডিত চার্লস উইলকিন্সের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু হস্তলিখিত পুঁথি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এবং সেগুলির লিখনশৈলী বিশ্লেষণ করে তিনি বাংলা হরফের একটি মান্য রূপ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।ইংরেজির লেখার পদ্ধতিকে আমরা বলতাম রোমক লিপি। ইংরেজি হরফ যেন একতলায় সারিবদ্ধ হয়ে এগিয়ে চলে। বিপরীতে বাংলা লিপির কাঠামো অনেক বেশি জটিল—যেন তিনতলা। ই, ঈ, উ, ঊ-সহ বিভিন্ন স্বরচিহ্ন বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করে নানা রূপ। রেফ, র-ফলা, য-ফলা, যুক্তাক্ষর—সব মিলিয়ে বাংলা লিপির নিজস্ব এক জটিল সৌন্দর্য রয়েছে। ক্ক, চ্চ, ট্ট, ত্ত, প্প থেকে শুরু করে ক্ষ্ম-এর মতো যুক্তাক্ষর আয়ত্ত করতে একসময় কম পরিশ্রম করতে হয়নি।বাংলা মুদ্রণ ও হরফ নির্মাণের ইতিহাসে চার্লস উইলকিন্সের পাশাপাশি পঞ্চানন কর্মকার এবং তাঁর জামাতা মনোহর কর্মকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। উইলকিন্স তাঁদের বাংলা হরফ নির্মাণের কৌশল শেখান। অথচ ইতিহাসের পাতায় আমরা পঞ্চানন কর্মকারকে যতটা মনে রেখেছি, উইলকিন্সের অবদান ততটা স্মরণে রাখিনি।বাংলা ভাষার বিকাশে ছাপাখানার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উইলিয়াম কেরি বাংলা-সহ একাধিক ভারতীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনা ও মুদ্রণের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁর উদ্দেশ্যের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রচারও ছিল। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস—এই ছাপাখানা ও মুদ্রিত গ্রন্থই পরবর্তীকালে ভারতীয়দের নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হওয়ার পথও প্রশস্ত করে।একসময় বাংলা ভাষায় পড়াশোনার তেমন চল ছিল না। পণ্ডিতদের কাছে সংস্কৃত ছিল অপরিহার্য, আর কাজের প্রয়োজনে আরবি ও ফারসি শেখার প্রয়োজন পড়ত। জমি-জমার দলিল, সরকারি নথি ও বিভিন্ন দস্তাবেজে দীর্ঘদিন আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার ছিল প্রবল। সেই প্রভাব আজও বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে স্পষ্ট। কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রও লিখেছিলেন—‘অতএব লিখি ভাষা যাবনী মিশাল।’অর্থাৎ, ভাষা এক জিনিস, লিপি অন্য। আজকের ডিজিটাল যুগে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া বা মোবাইলে কেউ বাংলা ভাষা লিখতে গিয়ে রোমক হরফ ব্যবহার করেন—বাংলা কথাকে ইংরেজি অক্ষরে প্রকাশ করেন। ফলে ভাষা বাংলা থাকলেও লিপি বদলে যায়। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ক্ষেত্রেও আমরা এমন বহু চিহ্ন ও অক্ষর ব্যবহার করি, যেগুলির আলাদা উচ্চারণ নিয়ে ভাবি না। @, #-এর মতো চিহ্নও এখন আমাদের দৈনন্দিন লেখালেখির অংশ।ইউরোপীয় পণ্ডিতদের একাংশ ভারতীয় ভাষাগুলিকে বুঝতে এবং ব্যাকরণবদ্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। মানোএল দা আসসুম্পসাঁও, নাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড প্রমুখের কাজ সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের লেখায় বাংলা ভাষা রোমক লিপির মাধ্যমে ইউরোপীয় পাঠকের কাছে পৌঁছয়। পরে উইলিয়াম কেরি বাংলা, মারাঠি, নেপালি-সহ নানা ভারতীয় ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করেন। রাজা রামমোহন রায়ও পরবর্তীকালে বাংলা ব্যাকরণ রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। বিদ্যাসাগরের হাত ধরে বাংলা গদ্য আরও সুসংবদ্ধ ও পরিশীলিত হয়, আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখনী সেই ভাষাকে এক অনন্য শিল্পরূপ দেয়।এবার আসা যাক সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকির প্রসঙ্গে। সাঁওতালি ভাষার ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ব্যাকরণ রচনার প্রচেষ্টা দেখা যায়। বিদেশি গবেষকদের লেখা সাঁওতালি ব্যাকরণের বইও পাওয়া যায়। কিন্তু অলচিকি লিপির আবির্ভাব তার অনেক পরে।অলচিকি লিপির বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মুর নাম। তিনি সাঁওতালি ভাষাকে নিজস্ব লিপির মাধ্যমে প্রকাশের জন্য অলচিকি লিপির বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।তাই বিষয়টি পরিষ্কার—সাঁওতালি এবং অলচিকি এক নয়। সাঁওতালি হল একটি ভাষা, আর অলচিকি হল সেই ভাষা লেখার একটি লিপি। ভাষা ও লিপির এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। কারণ কোনও ভাষা একাধিক লিপিতে লেখা যেতে পারে, আবার একটি লিপিও একাধিক ভাষা প্রকাশে ব্যবহৃত হতে পারে।সুতরাং ‘সাঁওতালি’ বললে আমরা একটি ভাষাকে বুঝব, আর ‘অলচিকি’ বললে বুঝব সেই ভাষার নিজস্ব লিপির ঐতিহ্যকে। এই দুইয়ের সম্পর্ক গভীর হলেও তারা এক এবং অভিন্ন নয়। – মৃদুল শ্রীমানী।