আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে সাহিত্য, সমাজচেতনা ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটল সোদপুরের লোক সংস্কৃতি ভবনে!

নিজস্ব সংবাদদাতা : গত ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে অনুষ্ঠিত হয় ত্রৈমাসিক স্বয়ংসিদ্ধা ওয়েবজিনের চতুর্থ বর্ষের মুদ্রিত বার্ষিক সংকলন ‘স্বয়ংসিদ্ধা বার্ষিকী’-র প্রকাশ অনুষ্ঠান।এই মঞ্চেই প্রদান করা হয় সম্পাদক ও বিশিষ্ট লেখিকা শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতার স্মৃতিতে প্রবর্তিত “স্বর্গত অশোক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫-২৬”। গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হলেও মানসম্পন্ন ভ্রমণকাহিনীর অভাবে এ বছর সেই বিভাগে পুরস্কার স্থগিত থাকে। তবে সংকলনে কেরালা ভ্রমণ নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য লেখা স্থান পেয়েছে।

শ্রীপর্ণার পিতা অশোক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯—যে দিনটি পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেই আবেগঘন প্রেক্ষাপটেই একদিন আগে ২০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানকে লেখিকা ব্যবহার করেন মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে সচেতনতার মঞ্চ হিসেবে। উপস্থিত ছিলেন ২০০৭ সাল থেকে মানবপাচারের শিকারদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা Destiny Foundation-এর প্রতিষ্ঠাতা স্মরিতা সেনগুপ্ত।অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত সাহিত্যিক সমরেশ বসু-র পুত্র, প্রবাসী সাহিত্যিক নবকুমার বসু। বিশেষ অতিথি ছিলেন বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষা ও লেখিকা কৃষ্ণা রায়। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ভাষা সংসদের প্রকাশক ও অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক বিতস্তা ঘোষাল, লেখিকা শ্যামলী রক্ষিত প্রমুখ। সাহিত্য ও সমাজসেবার এই সম্মিলিত উপস্থিতি অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

পুরস্কারপ্রাপকদের মধ্যে ছিলেন গল্পে অমিতাভ ঘোষ (লিপিকর), প্রবন্ধে ভাস্কর সিনহা এবং কবিতায় সমাদৃত দাস। অতিথি ও বিজয়ীদের উত্তরীয়, স্মারক, পুষ্পস্তবক ও বই দিয়ে সম্মানিত করা হয়। পাশাপাশি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ‘ডেস্টিনি ফাউন্ডেশন’-এর কর্ণধার স্মরিতা সেনগুপ্তর হাতে ২৫ হাজার টাকার চেক তুলে দেন এবং ভবিষ্যতেও এই সংস্থার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।আবেগঘন মুহূর্তে লেখিকা স্মরণ করেন তাঁর পিতার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন ও সংগ্রামের কথা—বিজ্ঞান ছাত্র হয়েও যিনি সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েও পারিবারিক দায়িত্বে তা ত্যাগ করেন। কন্যা হিসেবে শ্রীপর্ণার আক্ষেপ, জীবদ্দশায় বাবাকে কোনও বই উৎসর্গ করতে পারেননি। আরও বেদনাদায়ক, এই অনুষ্ঠান পরিকল্পনার কিছুদিন পরই তাঁর মায়ের প্রয়াণ ঘটে। সেই ব্যক্তিগত শোকের মাঝেই বাবার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান তাঁর কাছে গভীর তাৎপর্য বহন করে।অনুষ্ঠানের শেষে ছিল কবিতা ও অণুগল্প পাঠের আসর। শ্রীপর্ণার কন্যা উর্বী চ্যাটার্জীর সাবলীল সঞ্চালনা ও শুভঙ্কর চ্যাটার্জীর সুচারু আয়োজনে গোটা অনুষ্ঠান ছিল সুসংগঠিত। সাহিত্য, সমাজসচেতনতা ও ব্যক্তিগত আবেগ—সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল স্মরণীয়।