ভারতের ৯৫তম গ্র্যান্ডমাস্টার অরন্যক ঘোষের অনুপ্রেরণার গল্প!

নিজস্ব সংবাদদাতা : স্বপ্নপূরণ কখনওই সহজ হয় না—কখনও তা অর্জন করতে হয় ত্যাগের বিনিময়ে, কখনও লড়াইয়ের মাধ্যমে। ঠিক তেমনই এক বাস্তব গল্প লিখলেন বাংলার ছেলে অরন্যক ঘোষ, যিনি সম্প্রতি থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত Bangkok Chess Club Open-এ অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ভারতের ৯৫তম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক পরিবারের অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগের ইতিহাস—যা শুধু ক্রীড়াজগতেই নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুপ্রেরণা জোগাবে।অরন্যকের বাবা Mrinal Ghosh এবং মা Sanchita Ghosh—দু’জনেই ছেলের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা অনেকের কাছেই অকল্পনীয়। ২০১৪-১৫ সাল থেকেই হুগলির গঙ্গপুর গ্রামের পৈতৃক সম্পত্তি একে একে বিক্রি করতে শুরু করেন তাঁরা। তখনও অরন্যক আন্তর্জাতিক মাস্টারও নন। অরন্যক নিজেই জানিয়েছেন, “মায়ের বিয়ের গয়নাও বন্ধক রাখতে হয়েছিল। অন্য কোনো উপায় ছিল না। সেটা না করলে আমাকে দাবা খেলাই ছেড়ে দিতে হতো।” অরন্যকের বাবা জানান, ছোটবেলা থেকেই ছেলের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। ট্রফি নয়, বরং পুরস্কারের অর্থ—কারণ সেটাই সংসারের প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করত। “১০ বছর বয়সেই বুঝে গিয়েছিল, ট্রফি পরে আসবে, আগে দরকার অর্থ,”—বলছেন মৃণাল ঘোষ।

ভালো প্রশিক্ষণ বা স্পনসর—কিছুই ছিল না হাতে। এমনকি করোনা মহামারির সময়, অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতা খেলেই পরিবারের প্রায় ৮০ শতাংশ আয় যোগান দিতেন অরন্যক—যা এক অনন্য নজির। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পথে শেষ দুই নর্ম পেতে অরন্যককে প্রায় চার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। বারবার অল্পের জন্য সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, কিন্তু হাল ছাড়েননি। অবশেষে ব্যাংককে সেই স্বপ্নপূরণ। অরন্যকের কথায়, “এটা সত্যিই এক অসাধারণ যাত্রা—একটা ‘হেল অফ আ রাইড’।” এই গল্প শুধু অরন্যকের নয়, তাঁর বাবারও। স্কুলজীবনে দাবায় আগ্রহ থাকলেও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে সেই স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হয়েছিল মৃণাল ঘোষকে। কিন্তু ভাগ্যের খেলায়, ছোট্ট অরন্যকের হাত ধরেই আবার দাবার জগতে ফিরে আসেন তিনি। চার বছর বয়সে বাবার পুরনো দাবার সেট নিয়ে খেলা শুরু করে অরন্যক—আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। বর্তমানে FIDE-এর আর্বিটার হিসেবে কাজ করলেও, মৃণাল ঘোষের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় একটাই— “আমি অরন্যক ঘোষের বাবা।”

পরিবারের সাথে ভারতের ৯৫তম গ্র্যান্ডমাস্টার অরন্যক ঘোষ

অরন্যক ঘোষের এই সাফল্য শুধু একটি ব্যক্তিগত জয় নয়—এটি প্রমাণ করে দেয়, সীমিত সামর্থ্য থাকলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিবারের সমর্থন থাকলে অসম্ভবও সম্ভব। বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই দাবাড়ুর গল্প আজ হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের কাছে এক নতুন প্রেরণা।