মানবিক উদ্যোগে আশার আলো-অসহায় মানুষের পাশে স্থবির মানসিকতা!
নিজস্ব সংবাদদাতা : সমাজকর্মী নীলাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানবিক উদ্যোগে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন এক অসহায় বৃদ্ধা । শহর প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়ে নিজের মতো করে ছুটে চলে। সেই ভিড়ের মধ্যেই অনেক সময় হারিয়ে যায় কিছু মুখ,যাঁদের দিকে কেউ তাকায় না। গোলপার্ক মোড়ের রবীন্দ্র সরোবর থানার সামনে ফুটপাতে পড়ে থাকা এক বৃদ্ধাও ছিলেন তেমনই এক মুখ। অদৃশ্য, অবহেলিত, অন্ধকারে ঢাকা। শীতের সকাল। তাপমাত্রা প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুপুর বারোটা থেকে একটার মধ্যে, ব্যস্ত রাস্তার ধারে ফুটপাতে কাঁপতে থাকা ওই বৃদ্ধাকে প্রথম দেখতে পান সমাজকর্মী নীলাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়। গায়ে ছিল মাত্র একটি পাতলা ছেঁড়া সোয়েটার। ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে পড়েছিলেন তিনি। নীলাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে এসে প্রথমে তাঁকে একটি শাল দেন। কিন্তু শাল জড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তেই চোখে পড়ে যায় নির্মম সত্য—উনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। দুটো চোখেই দৃষ্টিশক্তি নেই। যে জায়গাটিতে তিনি দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছিলেন, সেটি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক। সামান্য অসাবধানতায় যে কোনো সময় পড়ে গিয়ে প্রাণ হারানোর আশঙ্কা ছিল।সেই মুহূর্তে নীলাদ্রি সিদ্ধান্ত নেন,এখানেই থামা যাবে না। শুধু দয়া নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। যদি সম্ভব হয়, এই বৃদ্ধার চোখে আবার আলো ফেরাতে হবে। আর তাঁকে ফুটপাতের জীবন থেকে উদ্ধার করতেই হবে।সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কলকাতা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি একের পর এক লায়ন্স ক্লাব ও চক্ষু চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দ্বারস্থ হন। বহু চেষ্টা ও দৌড়ঝাঁপের পর বৃদ্ধাকে লায়ন্স ক্লাবে নিয়ে গিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো হয়।কিন্তু রিপোর্ট ছিল হতাশাজনক। চিকিৎসকরা জানান, এই অবস্থায় সাধারণ ক্যাটারাক্ট অপারেশন সম্ভব নয়। অত্যন্ত জটিল ও বিশেষ পদ্ধতির চিকিৎসা প্রয়োজন—যা সব জায়গায় হয় না এবং যার খরচ সাধারণ গরীব মানুষের নাগালের বাইরে।তবুও তিনি হার মানেননি। তিনি বিভিন্ন মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। কিছু সহৃদয় মানুষ এগিয়ে এলেও প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তখন শেষ ভরসা হিসেবে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানানো হয় স্বাস্থ্য ভবনেও। স্বাস্থ্য সচিব এন এস নিগম র কাছেও পৌঁছে যায় বৃদ্ধার অসহায় অবস্থার কথা।এরপর যেন আলোর পথ খুলে যায়। সরকারি সহযোগিতায় বৃদ্ধাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নেন। চার দিন ধরে চলে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অবশেষে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সফলভাবে সম্পন্ন হয় কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্ট র মতো জটিল চক্ষু অপারেশন।কয়েকদিন হাসপাতালের শয্যায় কাটানোর পর সেই বৃদ্ধা আবার দেখতে পান আলো। চোখে ফিরে আসে দৃষ্টি। আজ তিনি আর ফুটপাতে পড়ে থাকা মানুষ নন। নিজের চোখের আলো নিয়ে তিনি ফিরে গেছেন নিজের বাড়িতে। ফিরে পেয়েছেন সম্মান, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার আশা।যে পৃথিবী একদিন তাঁকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল, আজ সেই পৃথিবী তিনি উপভোগ করতে পারবেন।এই ঘটনা শুধু একটি চিকিৎসার গল্প নয়। এটি এক সমাজকর্মীর অদম্য মানসিকতার গল্প। নীলাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায় সাথে তার বন্ধু পূর্বাশা মুখার্জী কে সাথে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এমন বহু নিঃশব্দ কাজ করে চলেছেন। আলোচনার বাইরে থেকেও যাঁর কাজ সমাজে গভীর ছাপ রেখে যায়।ফুটপাতের অন্ধকারে পড়ে থাকা একটি জীবনের জন্য যদি কেউ নিজের সময়, শ্রম আর মনুষ্যত্ব উজাড় করে দিতে পারেন—তাহলেই সমাজ এখনও বেঁচে থাকে। আর সেই বিশ্বাসই আবার প্রমাণ করলেন নীলাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায় আর পূর্বাশা মুখোপাধ্যায়।