ছেলের জুতোর জন্য মায়ের গয়না বিক্রি, আজ আইপিএলে নায়ক সাকিবের চোখে জল আনা গল্প
নিজস্ব সংবাদদাতা : আইপিএলের মঞ্চে কখনও কখনও এমন কিছু গল্প জন্ম নেয়, যা শুধু ক্রিকেট নয়, জীবনকেও নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। সোমবার রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের দুরন্ত জয়ের নেপথ্যে যেমন ছিলেন প্রফুল, তেমনই সমান আলো কেড়ে নিয়েছেন আর এক অভিষেককারী সাকিব হুসেন। বিহারের গোপালগঞ্জের মাটির ঘর থেকে উঠে আসা এই তরুণ পেসার নিজের প্রথম ম্যাচেই ৪ উইকেট তুলে রাতারাতি হয়ে উঠেছেন আইপিএলের নতুন সেনসেশন। প্রথম ওভারেই ফর্মে থাকা যশস্বী জয়সওয়ালকে ফিরিয়ে দেন সাকিব। এরপর নিজের ধারাবাহিক গতিময় বোলিংয়ে রাজস্থানের ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলে দেন। ৪ ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে ৪ উইকেট—ইকোনমি রেট মাত্র ৬। অভিষেক ম্যাচে এমন আগুনে বোলিং ভারতীয়দের মধ্যে সেরাদের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে তাঁকে। হায়দরাবাদের ৫৭ রানের জয়ে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের গল্প আরও হৃদয়স্পর্শী। সাকিবের ক্রিকেটযাত্রা কোনও বিলাসবহুল একাডেমি থেকে শুরু হয়নি। গোপালগঞ্জের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। সংসারে টানাটানি এতটাই ছিল যে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই ছিল চ্যালেঞ্জ। ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখলেও বড় বাধা ছিল অর্থ। একদিন কান্নায় ভেঙে পড়ে সাকিব মাকে বলেছিলেন, “মা, আমার জুতো নেই। খেলব কী করে?” সেই অসহায় মুহূর্তে মা সুবুকতারা খাতুন নিজের গয়না বিক্রি করে ছেলের জন্য জুতো কিনে দেন। মা শুধু একটাই কথা বলেছিলেন—“ভাল ক্রিকেটার হওয়ার আগে ভাল মানুষ হবি।” আজ সেই ত্যাগেরই প্রতিদান দিলেন ছেলে, দেশের সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করে। পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন, সাকিব ছোটবেলা থেকেই অবিশ্বাস্য পরিশ্রমী। টেনিস বলে স্থানীয় ম্যাচ খেলে ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার করতেন। সেই টাকা দিয়েই ধীরে ধীরে নিজের ক্রিকেটের সরঞ্জাম জোগাড় করতেন। ছোটবেলায় সাকিবের স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া। বাড়ির কাছে সেনার একটি স্টেডিয়ামে নিয়ম করে দৌড়াতে যেতেন। সেখানেই দুই জওয়ান তাঁর গতি ও শারীরিক সক্ষমতা দেখে পরিবারকে পরামর্শ দেন খেলাধুলায় মন দিতে। সেই পরামর্শই বদলে দেয় জীবন। কাকার কথায়, “ওর উপর আমাদের বিশ্বাস ছিল। জানতাম,এই পরিশ্রম একদিন ফল দেবে।” উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে দলে নিলেও একটিও ম্যাচ খেলার সুযোগ দেয়নি। পরে তাঁকে ছেড়েও দেয়। সেই আঘাত সাকিবকে ভেঙে দেয়নি, বরং আরও জেদি করে তোলে। নিজের গতি ঘণ্টায় ১৪২-১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ কিমি ছোঁয়ার লক্ষ্য নিয়েছিলেন। সেই পরিশ্রমই এ বার তাঁকে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের জার্সিতে এনে দিল।মাত্র ৩০ লক্ষ টাকায় বেস প্রাইসে তাঁকে দলে নেয় হায়দরাবাদ। আর প্রথম সুযোগেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, প্রতিভা কখনও চাপা থাকে না। যে ছেলের জন্য একদিন গয়না বিক্রি করতে হয়েছিল, আজ সেই ছেলে লাখো ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।