আইআইটি খড়গপুরে স্পিক ম্যাকে সম্মেলনের তৃতীয় দিন, যোগ-ধ্যান ও লোকশিল্পে মুগ্ধ প্রতিনিধিরা!

নিজস্ব সংবাদদাতা : আইআইটি খড়গপুরে অনুষ্ঠিত স্পিক ম্যাকে-র একাদশ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের তৃতীয় দিনটি পরিণত হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায়। এদিন ছাত্রছাত্রীরা শুধুমাত্র শিল্প পরিবেশনা উপভোগ করেই থেমে থাকেননি, বরং কর্মশালা, লোকনৃত্য, যোগ, ধ্যান এবং শাস্ত্রীয় শিল্পচর্চার মাধ্যমে ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গভীরভাবে অনুভব করার সুযোগ পান।ভোর ৪টায় ব্রহ্ম মুহূর্তে দিনের সূচনা হয়। স্বামী ত্যাগরাজানন্দ সরস্বতীর পরিচালনায় হঠ যোগ এবং পদ্মশ্রী প্রাপ্ত ওস্তাদ ওয়াসিফুদ্দিন ডাগরের নেতৃত্বে নাদ যোগে অংশ নেন প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি হার্টফুলনেস মেডিটেশন, ভাই মনপ্রীত সিং-এর গুরুবাণী পাঠ এবং ব্রহ্ম কুমারী সিস্টার মনীষার রাজ যোগ ধ্যান অংশগ্রহণকারীদের মনে প্রশান্তি ও আত্মঅনুসন্ধানের আবহ তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাস্তানগোই পরিবেশনায় মুগ্ধ করলেন YSNA পুরস্কারপ্রাপ্ত জনাব মাহমুদ ফারুকি।

এরপর অনুষ্ঠিত হয় শ্রমদান কর্মসূচি, যা স্পিক ম্যাকে-র আদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, নম্রতা ও সচেতন জীবনযাপনের মূল্যবোধ আরও দৃঢ় হয়।প্রাতঃরাশের পর ক্যাম্পাস যেন এক প্রাণবন্ত গুরুকুলে পরিণত হয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, নৃত্য, লোকসংস্কৃতি, নাট্যকলা, কারুশিল্প ও যোগচর্চা নিয়ে মোট ২৬টি নিবিড় কর্মশালায় ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেন। বিশিষ্ট গুরু ও শিল্পীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই অধিবেশনগুলি ভারতের প্রাচীন শিল্প ঐতিহ্যের এক বিরল অভিজ্ঞতা এনে দেয়।মধ্যাহ্নভোজ ও যোগ নিদ্রার পর শুরু হয় লোকসংস্কৃতি ও গল্প বলার ঐতিহ্যকে ঘিরে এক বর্ণময় বিকেল। দুপুর ২টায় এসএনএ পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রী তারাপদ রাজাক ও তাঁর দলের পরিবেশনায় পুরুলিয়া ছৌ নৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। দেবী দুর্গার অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়ের কাহিনি তুলে ধরা এই পরিবেশনায় ছিল জমকালো মুখোশ, যুদ্ধভঙ্গি ও মনোমুগ্ধকর অ্যাক্রোব্যাটিক্স। শিল্পীদের সংবর্ধনা জানান হরিচরণ ভূঁইয়া বরবয়ন।

পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত শশধর আচার্যের পরিবেশনায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মুগ্ধ করল সেরাইকেলা ছৌ।

দুপুর ৩টায় ময়ূর আর্ট সেন্টারের পরিবেশনায় ময়ূরভঞ্জ ছৌ নৃত্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। মুখোশ ছাড়াই শারীরিক অভিব্যক্তি ও নিখুঁত কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে রাসলতার সৌন্দর্য থেকে মহাভারতের চক্রব্যূহ পর্যন্ত নানা উপাখ্যান মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে। দর্শকদের কাছ থেকে পরিবেশনাটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়ে নেয়।বিকেল ৪টায় পদ্মশ্রী প্রাপ্ত শ্রী প্রহ্লাদ সিং টিপানিয়ার কবির গায়ন অনুষ্ঠানে এক আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়।

পদ্মশ্রী প্রহ্লাদ সিং টিপানিয়ার কণ্ঠে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মুগ্ধ করল কবির গায়ন

ঐতিহ্যবাহী লোকবাদ্যের সঙ্গে কবিরের দোহা পরিবেশন উপস্থিত সকলকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।রাতের সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল একের পর এক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনবদ্য পরিবেশনা। পদ্মভূষণ প্রাপ্ত বেগম পারভীন সুলতানার হিন্দুস্তানি কণ্ঠসঙ্গীত এবং পদ্মশ্রী প্রাপ্ত পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্যের সন্তুর পরিবেশনা দিনটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।এর আগে প্রতিনিধিরা বিদুষী সুজাতা মহাপাত্র ও তাঁর শিষ্যা সৌম্য দাসের ওডিসি নৃত্য পরিবেশনাও উপভোগ করেন।

ময়ূর আর্ট সেন্টারের পরিবেশনায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মুগ্ধ করল মনোমুগ্ধকর ময়ূরভঞ্জ ছৌ

মঙ্গলাচরণ – বিষ্ণু বন্দনা, অষ্টপদী – সখী হে, ওড়িয়া অভিনয় – কেদে চন্দ্র, শবরী এবং শঙ্করবর্ণম পল্লবী দর্শকদের মুগ্ধ করে। শিল্পীদের সংবর্ধনা জানান অজিত কুমার জানা।অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল পদ্মশ্রী প্রাপ্ত পণ্ডিত রনু মজুমদারের হিন্দুস্তানি বাঁশি পরিবেশনা। রাগ রাগেশ্রী দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর সুরেলা পরিবেশনা উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের এক ধ্যানমগ্ন অনুভূতির মধ্যে নিয়ে যায়। সঙ্গীতকে ধ্যানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বানও জানান তিনি।