যখন সময়ের দর্পণে ফিরে আসেন বিবেকানন্দ — দেবরাজ সাহা
“ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত থেমো না।"— স্বামী বিবেকানন্দ
সময় যখন নিজেকে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে চায়, সমাজ যখন মূল্যবোধের সংকটে দিশাহারা হয়, রাষ্ট্র যখন আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কয়েকজন মহামানবের জীবন ও দর্শন আবারও নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসে। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁদেরই একজন। তাঁর জীবন মাত্র উনচল্লিশ বছরের; অথচ সেই সংক্ষিপ্ত জীবন এমন এক দীর্ঘ ছায়া বিস্তার করেছে, যার পরিধি আজও ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। আজ তাঁর প্রয়াণদিবস। আর আজ কোন সমাপ্তির দিন নয়; বরং আত্মসমীক্ষার দিন, আত্মজাগরণের দিন এবং ভবিষ্যতের প্রতি নতুন অঙ্গীকারের দিন। মহাপুরুষদের মূল্য তাঁদের জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। সময়ই তাঁদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে। বিবেকানন্দও তেমনই এক ব্যক্তিত্ব, যাঁকে কেবল একজন সন্ন্যাসী বা ধর্মপ্রচারক হিসেবে চিহ্নিত করা তাঁর প্রতি অবিচার হবে। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, মানবতাবাদী, শিক্ষাচিন্তক, সমাজসংস্কারক, জাতীয় চেতনার নির্মাতা এবং সর্বোপরি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির এক নির্ভীক অনুসন্ধানী। তাঁর ধর্ম ছিল না বিভাজনের, তাঁর দেশপ্রেম ছিল না বিদ্বেষের, তাঁর শিক্ষা ছিল না কেবল জীবিকা অর্জনের উপায়। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের ভিতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলাই সভ্যতার সবচেয়ে বড় কাজ। আজকের পৃথিবী এক অভূতপূর্ব বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে। প্রযুক্তি মানুষের হাতকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু হৃদয়কে কতটা প্রসারিত করেছে সেই প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু প্রজ্ঞার অভাব স্পষ্ট। যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, অথচ মানুষ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ধর্মের নামে বিভাজন, রাজনীতির নামে বিদ্বেষ, অর্থনীতির নামে বৈষম্য এবং শিক্ষার নামে প্রতিযোগিতা আমাদের সমাজকে এমন এক অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সাফল্যের সংজ্ঞা আছে, কিন্তু জীবনের দর্শন প্রায় অনুপস্থিত। এই বাস্তবতায় বিবেকানন্দের চিন্তা নতুন করে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। তিনি মানুষকে প্রথমে মানুষ হতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর কাছে ধর্ম মানে ছিল না কেবল আচার বা উপাসনা; ধর্ম মানে ছিল চরিত্র, সাহস, দায়িত্ববোধ এবং অপরের প্রতি সহমর্মিতা। যে সমাজে ক্ষুধার্ত মানুষ আছে, যে সমাজে অবহেলিত মানুষের কান্না শোনা যায়, সেখানে ধর্মের প্রকৃত পরীক্ষা মন্দিরে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই। এই মানবধর্মের শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, মানুষের হৃদয়ের গভীরতায় পরিমাপ হয়। শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা আজও বিস্ময়করভাবে আধুনিক। আজ আমরা শিক্ষাকে প্রায়শই পরীক্ষার নম্বর, চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা প্রতিযোগিতার সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। অথচ বিবেকানন্দ শিক্ষা বলতে বুঝেছিলেন চরিত্রের বিকাশ, আত্মবিশ্বাসের উন্মেষ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা। তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা মানুষকে কেবল দক্ষ কর্মী নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং উদার হৃদয়ের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। আজ যখন শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে অথচ সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রেই কমছে, তখন তাঁর সেই শিক্ষা-দর্শন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে। তিনি কখনও উগ্র আবেগকে দেশপ্রেম বলে মনে করেননি। তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদ মানে ছিল আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং চরিত্রগঠন। তিনি এমন এক ভারতের কল্পনা করেছিলেন, যে ভারত নিজের ঐতিহ্যে গর্বিত হবে, আবার বিশ্বমানবতার প্রতিও সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। সংকীর্ণতা নয়, আত্মবিশ্বাসই ছিল তাঁর জাতীয় চেতনার ভিত্তি। আজ যখন দেশপ্রেমের ভাষা বহু সময়েই পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন বিবেকানন্দের উদার ও মানবিক জাতীয়তাবাদ নতুন করে ভাবতে শেখায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তিনি যুবসমাজকে কখনও করুণা করেননি; তিনি তাঁদের উপর আস্থা রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাগ্রত যুবসমাজই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। আজকের তরুণেরা প্রযুক্তিতে দক্ষ, বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন এবং সম্ভাবনাময়। কিন্তু একই সঙ্গে তারা অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, মূল্যবোধের সংকট এবং তীব্র প্রতিযোগিতার বাস্তবতার মুখোমুখি। এই সময়ে বিবেকানন্দের আহ্বান নতুন অর্থে ধ্বনিত হয় নিজের শক্তিকে চিনে নাও, নিজের চরিত্রকে গড়ে তোলো, মানুষের জন্য বাঁচতে শিখো। কারণ আত্মবিশ্বাসহীন প্রতিভা কখনও ইতিহাস রচনা করতে পারে না। এখন প্রশ্ন হল, আমরা কি সত্যিই বিবেকানন্দকে স্মরণ করি, নাকি কেবল তাঁকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা পালন করি? তাঁর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা সহজ, তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা কঠিন। তাঁর বাণী উদ্ধৃত করা সহজ, তাঁর মতো করে সমাজকে ভালোবাসা কঠিন। আজকের দিনে এই আত্মসমালোচনাই সবচেয়ে জরুরি। কারণ বিবেকানন্দ কোনও পূজিত প্রতীক নন; তিনি এক চলমান চ্যালেঞ্জ। তিনি প্রতিদিন আমাদের প্রশ্ন করেন আমরা কি নিজেদের ভয় জয় করেছি? আমরা কি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছি? আমরা কি জ্ঞানকে মানবকল্যাণের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছি? তাই আজকের এই দিনটি আমার কাছে মনে হয়েছে একটি আত্মপর্যালোচনার দিন। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ তাঁর জীবনদর্শনকে নতুন করে পাঠ করা, তাঁর সাহসকে নিজের সাহসে পরিণত করা এবং তাঁর মানবতাবাদকে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প নেওয়া। ইতিহাসে বহু মানুষ জন্ম নেন, বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু খুব অল্প কয়েকজনই এমন হন, যাঁদের প্রস্থান কালের প্রবাহকে থামাতে পারে না। তাঁরা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রতিটি প্রজন্মের কাছে নতুন করে ফিরে আসেন। স্বামী বিবেকানন্দ সেই বিরল মহামানবদের একজন। তাঁর দেহাবসান ঘটেছিল ৪ জুলাই ১৯০২ সালে; কিন্তু তাঁর চিন্তার মৃত্যু আজও ঘটেনি, ঘটার নয়। কারণ যে মানুষ আত্মমর্যাদা শেখান, যে মানুষ মানবতার ভাষায় ধর্মকে ব্যাখ্যা করেন, যে মানুষ তরুণের চোখে ভবিষ্যতের আলো দেখেন এবং যে মানুষ জাতিকে নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করতে শেখান তিনি কোনও নির্দিষ্ট যুগের নন। তিনি প্রতিটি যুগের প্রয়োজন, প্রতিটি সংকটের উত্তর এবং প্রতিটি নবজাগরণের অনিবার্য সূচনা।