নৈতিকতার প্রশ্নে কেন আজও প্রাসঙ্গিক দেশবন্ধু?

সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু কিছু মানুষ ইতিহাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে চিরকাল প্রাসঙ্গিক থেকে যান। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস তাঁদেরই একজন। তাঁর প্রয়াণের বহু দশক পরেও সমাজ, রাজনীতি এবং জাতীয় জীবনের নানা সংকটের মুহূর্তে বারবার ফিরে আসে তাঁর নাম, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর জীবনদর্শন। আজ আমরা প্রযুক্তিতে উন্নত, অর্থনীতিতে এগিয়ে, কিন্তু নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে কি সত্যিই সমৃদ্ধ হতে পেরেছি? চারপাশে তাকালে দেখা যায়, ব্যক্তিস্বার্থ অনেক ক্ষেত্রেই সমাজ ও দেশের স্বার্থকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। দেশপ্রেম অনেক সময় স্লোগান, প্রচার কিংবা সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। অথচ দেশবন্ধু শিখিয়েছিলেন, প্রকৃত দেশপ্রেমের ভিত্তি ত্যাগ, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। একজন সফল ব্যারিস্টার হিসেবে তাঁর সামনে ছিল আরামদায়ক ও সম্মানজনক জীবনের অসংখ্য সুযোগ। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে জাতির মুক্তিকে বড় বলে মনে করেছিলেন। সেই কারণেই তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত জীবন ছেড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর জীবন আজও প্রশ্ন তোলে— আমরা কি শুধু নিজের জন্য বাঁচছি, নাকি সমাজের প্রতিও আমাদের কোনও দায়িত্ব আছে? বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দেশবন্ধুর প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। আজ যখন আদর্শের চেয়ে প্রচার, জনসেবার চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি আলোচিত হয়, তখন তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনীতি মূলত মানুষের কল্যাণের জন্য। ক্ষমতা নয়, মানুষের আস্থা ও ভালোবাসাই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয়।

সেই কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে “দেশবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তাধারা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যে নিহিত। ধর্ম, ভাষা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন নয়, ঐক্যই জাতীয় অগ্রগতির পথ। বর্তমান সময়ে যখন বিভেদের রাজনীতি বিভিন্ন স্তরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন দেশবন্ধুর মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবনা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কাছেও দেশবন্ধু এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি শেখান যে জীবনের সার্থকতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়, সমাজকে কী দেওয়া গেল তার মধ্যেও নিহিত।

আত্মমর্যাদা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানবিক মূল্যবোধ— তাঁর জীবন এসব শিক্ষার উজ্জ্বল উদাহরণ। আজকের পৃথিবীতে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও প্রজ্ঞার অভাব, যোগাযোগের বিস্তার থাকলেও মানবিক দূরত্ব বেড়েছে। এই সময়ে দেশবন্ধুর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার আসল পরিচয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়, মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতায়। তাই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে স্মরণ করা মানে কেবল ইতিহাসের একজন মহান ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো নয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে নৈতিকতা, মানবিকতা, ঐক্য এবং জনসেবার মূল্যবোধকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আজ যখন সমাজে বিশ্বাসের সংকট, রাজনীতিতে আদর্শের সংকট এবং শিক্ষায় মূল্যবোধের সংকট স্পষ্ট, তখন দেশবন্ধুর জীবন ও দর্শন আমাদের সামনে এক আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখায়। ইতিহাসের কিছু মানুষ কখনও অতীত হয়ে যান না। তাঁরা যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে পথ দেখান। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস তেমনই এক চিরন্তন প্রেরণা, যাঁকে স্মরণ করা মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি উন্নত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্নকে শক্তিশালী করা। - দেবরাজ সাহা (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গল্পকার)