৩০০ বছরের পারিবারিক পুজো, দশমীতে তিন শতাধিক মানুষের নারায়ণ সেবা

৩০০ বছরের পারিবারিক পুজো, দশমীতে তিন শতাধিক মানুষের নারায়ণ সেবা

প্রেমচাঁদ ফৌজদার:সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা। কিন্তু বদলায়নি পূর্বপুরুষদের হাতে শুরু হওয়া পারিবারিক ঐতিহ্য। আজও নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো শিব-দুর্গা পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন বাঁকুড়ার বালিটা গ্রামের পশ্চিম বিশ্বাস পাড়ার বিশ্বাস পরিবারের সদস্যরা। জাঁকজমকপূর্ণ মণ্ডপ কিংবা আধুনিক মন্দির নয়, মাটির দেওয়াল ও অ্যাসবেস্টসের ছাউনির সাধারণ পরিসরেই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় তাঁদের আরাধনা। এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পরিবারের সদস্যদের কাছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পারিবারিক ঐক্য এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের এক জীবন্ত নিদর্শন।বিশ্বাস পরিবারের প্রবীণ সদস্য অচিন্ত্য কুমার বিশ্বাসের কথায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে পরিবারের কোনও এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। স্বপ্নে তাঁকে জানানো হয়েছিল, একটি পুকুরের মধ্যে শিব-দুর্গার মূর্তি রয়েছে। সেই স্বপ্নাদেশের পর পরিবারের ওই সদস্য পুকুর থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করে একটি খড়ের চালার নিচে পুজো শুরু করেন। সেই থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই আরাধনা। সময়ের সঙ্গে পুজোর আয়োজনের ধরনে কিছু পরিবর্তন এলেও ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে কোনও খামতি রাখতে চান না পরিবারের সদস্যরা।বর্তমানে বিশ্বাস পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৪২ জন। পরিবারের ছয়টি শাখার সদস্যরা একত্রিত হয়ে দশ দিন ধরে এই পুজোর আয়োজন করেন। পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় আজও সাধারণ পরিকাঠামোর মধ্যেই পুজো সম্পন্ন হয়। তবে আর্থিক জাঁকজমকের চেয়ে তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বপুরুষের শুরু করা প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো চালিয়ে যাওয়া।পরিবারের সদস্যদের কাছে এই পুজো এক মিলনক্ষেত্রও বটে। বছরের এই বিশেষ সময়ে পরিবারের সকলের একত্রিত হওয়া, পুজোর আয়োজন করা এবং প্রথা মেনে বিভিন্ন আচার পালন করার মধ্য দিয়ে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তিন শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও তাঁদের কাছে সমান আবেগের।বিশ্বাস পরিবারের সদস্যদের কথায়, তাঁদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কয়েকজন একসময় বিষ্ণুপুরের মল্লভূমের রাজার অধীনে কাজ করতেন। তাঁদের দাবি, সেই সময়ে কাজের মাধ্যমে তাঁরা রাজার আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। পরিবারের প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁদের পূর্বপুরুষদের পদবি আগে ছিল ‘মণ্ডল’। পরবর্তীকালে রাজার কাছ থেকে ‘বিশ্বাস’ পদবি লাভ করেন তাঁরা। যদিও এই ইতিহাসের স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি, পরিবারের সদস্যদের মুখে মুখে এই কাহিনি আজও প্রচলিত রয়েছে।এই শিব-দুর্গা মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আরও একটি বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। পরিবারের সদস্য জ্যোতির্ময়ী বিশ্বাস, অতনু বিশ্বাস, পার্থ বিশ্বাস, মুন্না বিশ্বাস, কালীপদ বিশ্বাস ও টোটন বিশ্বাসের বক্তব্য, মন্দির থেকে ভক্তদের দৈব ওষুধ দেওয়া হয় বলে তাঁদের বিশ্বাস। তাঁদের দাবি, অর্শের সমস্যা এবং ঘুমের মধ্যে বিছানায় প্রস্রাব করার মতো সমস্যায় ভুগতে থাকা কিছু মানুষ মানত করে উপকার পেয়েছেন বলে জানান।তবে এই ধরনের রোগ নিরাময়ের দাবির পক্ষে কোনও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণের কথা জানা যায়নি। তাই এমন সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তা সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষের একাংশের কাছে মন্দিরটি ধর্মীয় আস্থা ও মানসিক ভরসার জায়গা হিসেবে পরিচিত।এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দশমীর দিনের নারায়ণ সেবা। পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে ওই দিন তিন শতাধিক মানুষের জন্য ভোগ ও প্রসাদের আয়োজন করা হয়। বহু মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রসাদ গ্রহণ করেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে এই আয়োজন কেবল পুজোর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার একটি প্রয়াস।বালিটা গ্রামের পশ্চিম বিশ্বাস পাড়ার এই শিব-দুর্গা পুজো তাই তিনশো বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যকে বহন করার পাশাপাশি সামাজিক সংযোগেরও একটি উদাহরণ। সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, সাধারণ পরিকাঠামো এবং সময়ের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও বিশ্বাস পরিবারের সদস্যরা যে নিষ্ঠার সঙ্গে এই প্রাচীন পুজোকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তা গ্রামবাংলার পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্য ও আবেগের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

\\\\\\\\n\\\\\\\\n\\\\\\\\n\\\\n\\\\n\\n\\n\n\n