Skip to content

সর্বগ্রাসী বন্যায় কাঁদছে অসম,ভেসে যাচ্ছে জীবন-জীবিকা,বাড়ছে মৃতের সংখ্যা

নিজস্ব সংবাদদাতা :অসমজুড়ে যেন প্রকৃতির তাণ্ডব। চারদিকে শুধু জল আর জল। তলিয়ে গিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম, ডুবে রয়েছে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, কৃষিজমি। বন্যার জলে ভেসে আসছে মানুষের মৃতদেহ, শত শত গবাদি পশুর নিথর দেহ। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রাস্তায়, বাঁধের উপর কিংবা অস্থায়ী ত্রাণশিবিরে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এত ভয়াবহ বন্যা অসম দেখেনি বলেই মনে করছেন প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। রাজ্যের একাধিক জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। শিবসাগর, চরাইদেউ, গোলাঘাট, যোরহাট, শোণিতপুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন। বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে পাঁচটি প্রধান নদী। বহু এলাকায় যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জলমগ্ন গ্রামগুলিতে উদ্ধারকাজ চালাতে নৌকাই এখন একমাত্র ভরসা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত আনুমানিক ৭৫ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। তবে উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যায় ৭ লক্ষ ২১ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৯০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিবসাগর জেলা, যেখানে কয়েক লক্ষ মানুষ বন্যার কবলে পড়েছেন। বন্যার জেরে শুধু মানুষের জীবন নয়, ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি ও পশুপালনও। প্রশাসনের দাবি, প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পাঁচশোরও বেশি খামার জলের তলায় চলে গিয়েছে এবং কয়েকশো গবাদি পশু মারা গিয়েছে বা ভেসে গিয়েছে। বহু পরিবার তাদের বছরের একমাত্র জীবিকার উৎস হারিয়ে দিশেহারা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই ৪৮৭টি ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি শতাধিক ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে কয়েক লক্ষ দুর্গত মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রী, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর পাশাপাশি বায়ুসেনার হেলিকপ্টার এবং কয়েক ডজন উদ্ধারকারী নৌকা মোতায়েন করা হয়েছে।

অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, এই বছরের বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় এবং রাজ্যের কিছু অংশের অবস্থা কার্যত বর্ণনাতীত। তাঁর বক্তব্য, শিবসাগর ও চরাইদেউয়ের মতো এলাকায় এমন ভয়াবহ বন্যা অতীতে খুব কমই দেখা গিয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও উন্নত দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনার উপর জোর দেন। বন্যার বিভীষিকার এক হৃদয়বিদারক ছবি উঠে এসেছে যোরহাট জেলার বাসিন্দা ১৮ বছরের স্যালিঁ পাত্রের কথায়। তিনি জানান, কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রবল স্রোতে তাঁদের বাড়ি জলের তলায় চলে যায়। বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে ঘরে থাকা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন, প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়েছে তাঁদের বহু বছরের স্বপ্নের বাড়ি। এখন ত্রাণশিবিরই তাঁদের একমাত্র আশ্রয়।

এই ভয়াবহ দুর্যোগের মাঝেও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে অসমজুড়ে। অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে দুর্গতদের উদ্ধার করছেন। নৌকায় করে খাদ্য, ওষুধ, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে দুর্গম এলাকায়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য রান্না করা হচ্ছে খাবার। অনেকেই নিজের ঘর খুলে দিয়েছেন আশ্রয়হীন পরিবারগুলির জন্য।অসমের এই নজিরবিহীন বন্যা আবারও প্রশ্ন তুলছে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে। আপাতত বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় গোটা রাজ্য। কিন্তু জল নামলেও বহু মানুষের জীবনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা মুছে যেতে সময় লাগবে অনেক।

Latest