Skip to content

আডা লাভলেস: দীপ্তি ও দাহের এক বিষাদপ্রতিমা!

মৃদুল শ্রীমানী: কমপিউটার আর তার প্রোগ্রামিং গড়ে ওঠার ভিতরকথাটা যাঁরা চর্চা করবেন, আডা লাভলেস ( ১০ ডিসেম্বর ১৮১৫ - ২৭ নভেম্বর ১৮৫২) কে তাঁদের জানতেই হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও বাড়িতে, গুণিজনসঙ্গ করে, নিজের অপূর্ব মেধায় কমপিউটারের প্রোগ্রামিং এর বিকাশের ইতিহাসে আডা লাভলেস নিজেকে স্মরণীয় উচ্চতায় তুলে ধরেছিলেন। গত ২৭ নভেম্বর আডা লাভলেস এর প্রয়াণদিবস ছিল। ১৮৫২-র ২৭ নভেম্বর তারিখে তাঁর মৃত্যু হয়। চার্লস ব‍্যাবেজ অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন নামে একটি গণনযন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। আডা, তখন সদ‍্যোতরুণী একটি মেয়ে, ব‍্যাবেজের এই যন্ত্রটি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন দিয়ে আরো অনেক দূর এগোনো সম্ভব। তিনি এই যন্ত্র নিয়ে চর্চা করে একে আরো বিকশিত হতে সহযোগিতা করেন। আডা লাভলেসকে বিশ্বের প্রথম কমপিউটার প্রোগ্রামার বলা হয়। গত২৭ নভেম্বর থেকে ১৭৩ বছর আগে, মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে এই প্রতিভাময়ী বিজ্ঞানীর প্রয়াণ হয়। আডা লাভলেসের নশ্বর জীবন নানাবিধ নেশায় কবলে পড়ে ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। তার উপরে আডা লাভলেস বিবাহিত জীবন টপকে বহু পুরুষসঙ্গ করতে ভালবাসতেন। আর তাঁকে জড়িয়ে বিস্তর কেচ্ছা রটেছিল। প্রেমপত্র লিখতে ভালবাসতেন খুব। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে তাঁর স্বামী একশটির মতো প্রেমপত্র সেইসব পুরুষদের থেকে সংগ্রহ করে নষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আডা লাভলেসের ছিল সাংঘাতিক মদের নেশা। সে নেশা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, শেষকালে তিনি খাওয়াদাওয়ার বদলে মদ খেয়েই দিন কাটাতেন। একটা সময় তিনি নিজের শরীরের উপর মদ আর আফিঙের নেশার প্রভাব ঠিক কেমন, তা নিয়ে একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণা করবার কথা ভাবছিলেন।ঘোড়দৌড়ের জুয়া ছিল আডা লাভলেসের আরেকটি সাংঘাতিক নেশা। এই জুয়ার বাজির টাকা যোগাড় করতে আডা লাভলেস নিজের অনেকগুলি হীরে মাণিক বিক্রি করেছিলেন। তিনি ছিলেন অসামান্য গণিত প্রতিভার অধিকারী, আর এই তীক্ষ্ণ গণিতপ্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ঘোড়দৌড়ের বাজি জিতবার মতলব আঁটতেন। কিন্তু বাজি জেতা দূরস্থান, জুয়ার নেশায় তাঁর সাংঘাতিক দেনা হয়ে গিয়েছিল। জুয়ার নেশার পাশাপাশি আফিঙের নেশাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। তারপর ধরল রোগ। জরায়ুর ক‍্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ক্রমশ তিনি একটি যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর দিকে ছুটে চলেছিলেন।ডাক্তারেরা আফিঙের সাহায্যে যন্ত্রণার বোধ স্তিমিত করে এবং শরীরের স্থানে স্থানে কেটে রক্ত বের করে দিয়ে আডাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এই সব কোনো কিছুই তাঁর রোগকে দমাতে পারে নি। শেষকালে, ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে ২৭ নভেম্বর, মাত্র ছত্রিশ বৎসর বয়সে আডা লাভলেসের জীবনাবসান হয়।

The First Computer Program – In Delphi – The Podcast at Delphi.org

মৃত্যুর সময়ে নিঃস্ব আডার দেনার পরিমাণ ছিল সেকালের অঙ্কে দুহাজার পাউণ্ড। মৃত্যুর পর ইংল‍্যাণ্ডের লণ্ডন শহরের নটিংহ‍্যাম এলাকায় হ‍্যাকনাল এ সেন্ট মেরি ম‍্যাগদালেন চার্চের উঠানে, তাঁকে তাঁর বিখ্যাত কবি পিতার সমাধিস্থলের পাশেই সমাহিত করা হয়।অথচ, আডার জীবন সম্পূর্ণ অন‍্যরকম হতেই পারত। তাঁর মা আনাবেল মিলব‍্যাঙ্ক বায়রন ছিলেন একজন কড়া ধাঁচের হিসেবি বাস্তববাদী মহিলা। মা চেয়েছিলেন আডার মধ‍্যে যেন তার উচ্ছৃঙ্খল বেহিসেবি সুরাপায়ী যৌনতালিপ্সু পিতার চরিত্রের ন‍্যূনতম ছায়াপাত না ঘটে। তাই আডার জন্মের মাসখানেক পরেই অসামান্য প্রতিভাবান ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন (২২ জানুয়ারি ১৭৮৮ - ১৯ এপ্রিল ১৮২৪) এর সঙ্গে সমস্ত সংশ্রব ছিন্ন করে মা আনাবেল মেয়ে আডাকে যুক্তিবাদী ও বাস্তববাদী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গণিত নিয়ে পড়াশুনায় প্রণোদিত করেন।

Ada Lovelace: STEM Pioneer – Millennial Matriarchs

আডা লাভলেসের বিয়ে হল ঊনিশ বছর বয়সে। বিয়ের তারিখটি ছিল জুলাই মাসের আট, ১৮৩৫। পাত্র হলেন উইলিয়াম কিং। বিয়ের কয়েকটি বছর পরে ১৮৩৮ এ আডার বর কিং লাভলেসের আর্ল হলেন।সেই সুবাদে আডা হলেন কাউন্টেস অব লাভলেস।আর্ল হল যথেষ্ট উচ্চ এক রাজকীয় প্রশাসনিক পদ। ইংল‍্যাণ্ডের এই রাজকীয় পদের ধারণাটি জার্মান ঐতিহ্য থেকে এসেছে। রাজ‍্যের বড় বড় প্রশাসনিক বিভাগকে আর্ল বলা হয়। রাজকীয় এই প্রশাসনিক ক্ষমতাবিন‍্যাসে সবচেয়ে নিচে আছেন ব‍্যারন। তার উপরে ভাইকাউন্ট, তার উপরে আর্ল। আর্লের উপরে যথাক্রমে মার্কুইস এবং ডিউক। ডিউকের ক্ষমতার এলাকাকে ডাচি বলা হয়। ডিউকের উপর মনার্ক, তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধীশ্বর।যাই হোক, স্বামী আর্ল হলে আডা পরিচিত হলেন লেডি আডা কিং নামে। তবে আপনজনেদের কাছে হয়ে উঠলেন আডা লাভলেস।অগাস্টা আডা লাভলেসকে কমপিউটার প্রোগ্রামিং এর পথিকৃৎ হিসেবে গণ‍্য করা হয়। ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বৎসর অক্টোবরের পনেরো তারিখে আডা লাভলেস দিবস পালনের মধ‍্য দিয়ে গণিত এবং বিজ্ঞানে মহিলাদের অবদানের কথা, বিশেষতঃ যেগুলি তত নজরে আসে না, সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়। মূল অনুষ্ঠানটি হয় লণ্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজে। আডা লাভলেসের স্মরণে "আডা ইনিশিয়েটিভ" নামে সংস্থা গড়ে উঠেছে। এই সংস্থাটি অব‍্যবসায়িক লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান এবং এই সংস্থা যে মহিলারা বিজ্ঞান এবং গণিতের ক্ষেত্রে কাজ করছেন, তাঁদেরকে বিভিন্ন কনফারেন্সে নিজেদের গবেষণাকে তুলে ধরতে সহায়তা করেন, এবং এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন।

Remembering Ada Lovelace: The World's First Computer Programmer

আডা ইনিশিয়েটিভ এর একজিকিউটিভ ডিরেক্টর ভ‍্যালেরি অরোরা বলেছেন, আডা লাভলেস তাঁর নিজের সময়ে একজন মহিলা গণিত গবেষণায় কতটা উচ্চে পৌঁছতে পারেন, তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তাঁকে তাঁর পরিবার শুধু গণিত শিখতে দিয়েছিল, তাই নয়, গণিত শিখতে পর্যাপ্ত উৎসাহ যোগানো হয়েছিল। লাভলেস দেখিয়েছেন, সুযোগ সুবিধা করে দিলে মেয়েরা কোন্ উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারেন।লাভলেসের জীবনে বড় সুযোগ এসে গেল যখন তিনি বিখ‍্যাত গণিতজ্ঞ চার্লস ব‍্যাবেজ (২৭ ডিসেম্বর ১৭৯১ - ১৮ অক্টোবর ১৮৭১) এর সঙ্গে পরিচিত হলেন। ব‍্যাবেজের কথা বালিকা আডাকে শুনিয়ে রেখেছিলেন তাঁর ব‍্যক্তিগত শিক্ষয়িত্রী মেরি সমারভিল (২৬ ডিসেম্বর ১৭৮০ - ২৯ নভেম্বর ১৮৭২)। মেরি সমারভিল ঊনবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের কুইন বা রানী হিসাবে অভিনন্দিত হতেন। সমারভিল ছিলেন প্রথম মহিলা যাঁকে রয়‍্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক‍্যাল সোসাইটি নিজের বৃত্তে সাম্মানিক সদস‍্যপদ দিয়ে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল। ওঁর সঙ্গেই প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন আরেকজন গুণী মহিলা জ‍্যোতির্বিদ ক‍্যারোলিন হার্শেল, সম্পর্কে যিনি উইলিয়াম হার্শেল এর ভগিনী ছিলেন।
মেরি সমারভিল তাঁর ছাত্রী আডার মধ‍্যে গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত যে উন্নতি সেই সময়ে ঘটে চলেছে, তার দিকে আকৃষ্ট করেন। আডার আরেক শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ ও লজিশিয়ান অগাস্টা ডি মরগ‍্যান ( ২৭ জুন ১৮০৬ - ১৮ মার্চ ১৮৭১)।

Ada Lovelace: “The world's first computer programmer” – Murf's Turf

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের ৫ তারিখে লণ্ডনে একটা ভোজসভায় উছলে ওঠা ধনাঢ‍্য স্ফূর্তির পরিবেশে সপ্তদশী কিশোরী আডার সঙ্গে চার্লস ব‍্যাবেজের প্রথম দেখা। তখন ব‍্যাবেজের বয়স বেয়াল্লিশ বছর এবং তিনি একজন বিপত্নীক ব‍্যক্তি।ব‍্যাবেজ ওই ভোজসভায় আগ্রহের সঙ্গে তাঁর আবিষ্কৃত ডিফারেন্স ইঞ্জিন মেশিন নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এই ডিফারেন্স ইঞ্জিন মেশিন ছিল টাওয়ারের মতো একটা যন্ত্র, যাতে অনেকগুলি নম্বর খোদিত চাকা ছিল এবং একটি হাতল ঘোরালে সেই সব চাকা ঘুরে নির্ভরযোগ্য গণনা করে দিত। এর কয়েক দিন পরে, আডার মা আনা বেল কন‍্যাকে নিয়ে ১ ডরসেট স্ট্রিটে চার্লস ব‍্যাবেজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে ব‍্যাবেজের বৈঠকখানায় আডা এই যন্ত্রের অসম্পূর্ণ সংস্করণ দেখে অবাক হয়েছিলেন। এর পরেই শুরু হল ব‍্যাবেজের সঙ্গে এই যন্ত্রের সম্ভাবনা এবং আডার নিজস্ব গণিত গবেষণা নিয়ে আডার তরফে চিঠিপত্রের বন‍্যা। আডা লাভলেস ১৮৩৫ এর জুনের দশ তারিখ থেকে ১৮৫২ র ১২ আগস্ট পর্যন্ত এইসব চিঠি লিখেছিলেন। ১৮৩৯ সালে ব‍্যাবেজ আডাকে লিখেছিলেন গণিত নিয়ে তোমার আগ্রহ এতটাই মজবুত যে, তোমার বক্তব্যগুলিকে আমি নিশ্চিন্তে ভরসা করতে পারি।ডিফারেন্স ইঞ্জিন লগারিদমের অঙ্ক ও ত্রিকোণমিতিক অঙ্ক করে উঠতে পারার মতো করে তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু যন্ত্রটি তৈরি হয়ে উঠতে উঠতেই যন্ত্রের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার যোসেফ ক্লিমেন্ট (১৩ জুন ১৭৭৯ - ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৪) এর মধ‍্যে মতানৈক্য শুরু হয়ে গেল।এর ফলে মেশিন গড়তে গিয়ে যে অর্থসাহায্য ব্রিটিশ সরকারের তরফে পাবার সুযোগ গড়ে উঠছিল, তা বেকায়দায় পড়ল।এই সময়েই ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে চার্লস ব‍্যাবেজ নতুনভাবে আরেকটি মেশিনের কথা ভাবেন। এর নাম দেন অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন। ব‍্যাবেজ এই যন্ত্র এমনভাবে পরিকল্পনা করছিলেন যাতে এটা আরো বিভিন্ন ধরনের গণিত সমস্যার সমাধান অধিকতর নিপুণতার সঙ্গে করতে পারে। একটি যন্ত্র জটিলতর গণনার কাজে অংশগ্রহণ করছে, এই ধারণাটা কিশোরী আডাকে দারুণভাবে চমৎকৃত করে।

ব‍্যাবেজকে লেখা তাড়া তাড়া চিঠির সূত্রে আডার গণিত জীবন অন‍্য মাত্রায় বিকশিত হয়ে উঠতে থাকে। ব‍্যাবেজ কিশোরী আডার গণিত পারদর্শিতায় চমৎকৃত হয়ে আডাকে "সংখ‍্যার মোহময়ী যাদুকরী" হিসেবে অভিহিত করলেন।সংখ‍্যার উপর আডার অসামান্য দখল দখল দেখে তাঁর স্বামী উইলিয়াম কিং ও চমৎকৃত হয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী যে একজন বিরল গণিতপ্রতিভাধর মানুষ, সেটা কিং বুঝতে পারতেন। তিনি আডাকে যথেষ্ট ভালবাসতেন, এমনকি স্নেহ করতেন। তিনি স্ত্রীর গবেষণায় আগ্রহকে উৎসাহিত করতেন। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিং ও আডার দাম্পত্য মোটামুটি সুখের ছিল।আডা যখন ছোট ছিলেন, সেই শৈশবে তিনি একবার হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাইতে শিশু বয়সেই তিনি খানিকটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছিলেন। দুর্বল শরীরে শৈশব থেকেই খেলাধূলার পরিবর্তে আডার সময় কাটত পরিশ্রমসাধ‍্য লেখাপড়ায়। শিল্পবিপ্লব আর তার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং প্রযুক্তির নানা দিক উন্মোচনে আডার তীব্র আগ্রহ জন্মেছিল। তাঁর মা আনা বেল ভীষণ ভাবে সতর্ক থাকতেন যাতে আডা কিছুতেই তার প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানতে না পারে। সে যেন টেরটি না পায় যে সে অসামান্য প্রতিভাশালী ইংরেজ কবি লর্ড বায়রনের কন‍্যা। সে যেন ধরতেই না পারে অমন দেবোপম নক্ষত্রতুল‍্য কাব‍্যপ্রতিভার রক্তস্রোত তার স্নায়ুতে শিরায় বহমান। অথচ বেশ বোঝা যাচ্ছিল, আডার শরীর মনের দু কূল ছাপিয়ে সৃজনীশক্তির বন‍্যা দেখা দিয়েছে। তারই ঝোঁকে আডা না কি বলেছিলেন, যদি তুমি আমায় কবিতা দিতে নাই পারো, তাহলে কাব‍্যিক বিজ্ঞানের বিভূতিতে আমাকে সিঞ্চিত করো। অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিনের মধ‍্যে আডা সেই কাব‍্যিক বিজ্ঞানের সন্ধান করলেন।ব‍্যাবেজ নিজের তৈরি যন্ত্রের গণনার পারিপাট‍্য লক্ষ্য করছিলেন।

The World's First Computer Algorithm | by Bhavesh Agone | Towards AI

কিন্তু কিশোরী আডা তার নবীন দুটি ডাগর আঁখি মেলে ওই অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিনের সূত্রে গণিতের বিকাশের আরো সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা দেখেছিলেন। যেন আডার সমস্ত শরীর মন বলছে, যদি তুমি আমায় কবিতা দিতে নাই পারো, কাব‍্যিক বিজ্ঞানের বিভূতিতে আমাকে সিঞ্চিত করো। ব‍্যাবেজ লক্ষ্য করেছিলেন, আডা অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিনকে গভীরভাবে বুঝতে পারছেন।ব‍্যাবেজ নিজের যন্ত্রকে জনপ্রিয় করতে ও বিশেষ করে অর্থসংকট মেটাতে ইটালির তুরিন-এ গিয়েছিলেন। সেখানে লুইজি ফেদেরিকো মেনাব্রিয়া ( ৪ সেপ্টেম্বর ১৮০৯ - ২৫ মে ১৮৯৬) নামে এক গণিতবিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। মেনাব্রিয়া ১৮৪২ - ৪৩ খ্রিস্টাব্দে ছিলেন একজন মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষ। মেনাব্রিয়া পরে ইটালির সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের কার্যকাল ছিল ২৭ অক্টোবর ১৮৬৭ - ১৪ ডিসেম্বর ১৮৬৯। অর্থসংকট সমাধান করতে ব‍্যাবেজ মেনাব্রিয়াকে ধরে পড়লেন যাতে তিনি অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন নিয়ে একটি রিভিউ লেখেন। মেনাব্রিয়া সে অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন।আট হাজার শব্দের এই রিভিউটি ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে ট্রানজাকশনস অফ ফরেন অ্যাকাডেমিক অফ সায়েন্স অ্যাণ্ড লার্নেড সোসাইটিজ নামে একটি সুইস অ্যাকাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত হয়।মেনাব্রিয়া তাঁর রিভিউটি লিখেছিলেন ফরাসি ভাষায়। অধিক সংখ‍্যক পাঠকের কাছে পৌঁছনোর আশায় ব‍্যাবেজ আডাকে মেনাব্রিয়া-র রিভিউটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের দায়িত্ব দিলেন। তখন তরুণী আডা মেনাব্রিয়া-র লেখাটি শুধুমাত্র অনুবাদ করেই ক্ষান্ত হলেন না, তাকে বিকশিত করে তাতে আরো নানা প্রাসঙ্গিক গভীর বিশ্লেষণপূর্ণ ব‍্যাখ‍্যা ও টীকাভাষ‍্য জুড়ে , নানাবিধ গণনায় সমৃদ্ধ করে, নতুন নতুন অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণায় সম্পৃক্ত করে তাকে তিনগুণ দীর্ঘ করে তুললেন। বিশেষ করে উল্লেখ করা দরকার যে, এতে মূল বিষয়ের সঙ্গে সমন্বিত অত‍্যন্ত দুরূহ এবং অ্যাবস্ট্র‍্যাক্ট বা বিমূর্ত কিছু প্রশ্নের সমাধান যুক্ত করায় বাস্তবে লেখাটি একটি নতুন সৃজনীকর্মের পর্যায়ভুক্ত হয়।ব‍্যাবেজের অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন নিয়ে লাভলেসের এই গবেষণাপত্র ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড টেলরের সায়েন্টিফিক মেমোয়ার্সের তিন নং ভলিউমে প্রকাশিত হয়। সেকালে লেখক হিসেবে মেয়েদের নাম সামনে আনার রীতিটা খুব চালু ছিল না। সন্দর্ভটির লেখকের নাম "এএএল" হিসেবে প্রকাশিত হয়। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা অবশ‍্য জানত এএএল মানে আডা লাভলেস। তাঁরা লেখাটির সুপ্রচুর প্রশংসা করতে থাকেন। কিন্তু যে জিনিসটি তখন অনেকে ধরতেই পারেন নি যে আডা এখানে লিখেছিলেন, কেন এবং কিভাবে এই অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিন একটি নির্দিষ্ট গণিতসমস‍্যা সমাধান করতে পারে। এই ব‍্যাখ‍্যাটিকে "নোট জি" নামে চিহ্নিত করা আছে। এবং কেন ও কিভাবে, এই ব‍্যাখ‍্যার জন‍্যই এই "নোট জি" কে প্রথম কমপিউটার প্রোগ্রাম বলা হয়। গণিতের ধারণা নিয়ে তাকে বিকশিত করে তুলতে তুলতেই আডা গড়ে তুলেছিলেন সায়েন্স অফ অপারেশনস, এবং এই সায়েন্স অফ অপারেশনস নিজেই একটা স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক শাখা হিসেবে গড়ে উঠল আর এর মধ্যে বিমূর্ত সত‍্য এবং মূল‍্যও প্রতিষ্ঠা হল। অনেক পরবর্তীকালের বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক জেমস ইসিঞ্জার তাঁর ব‍্যাবেজ ও আডা সংক্রান্ত গবেষণার সূত্রে লেখা জ‍্যাকোয়ার্ডস ওয়েব (২০০৪), আডা লাভলেস (২০১৩) বইগুলিতে বিশদে ব‍্যাখ‍্যা করে বলেছেন, আডা এইভাবে কমপিউটিং সায়েন্সকে আবিষ্কার করেছেন এবং গণিতের থেকে তাকে পৃথক একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন। জেমস ইসিঞ্জার বলেছেন, আডা যেটাকে সায়েন্স অফ অপারেশন স বলেছিলেন, সেটা আসলে কমপিউটিং সায়েন্স।আডার যত গুণগ্রাহী বন্ধু ছিলেন, তাঁরা অনেকেই মেধাগত প্রশ্নে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। আর চার্লস ব‍্যাবেজও বুঝতে পারছিলেন আডা অ্যানালিটিক‍্যাল ইঞ্জিনকে নিয়ে ভাবনার যে উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছেন তা কালে মূল আবিষ্কারক হিসেবে তাঁকে ছাড়িয়ে যাবে। এইজন্যই যেন তিনি নিজেকে আডার কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। অবশ‍্য যন্ত্র গড়ে তোলার জন‍্য অর্থসংগ্রহেও ব‍্যাবেজকে সময় খরচ করতে হত।১৮৪৩ এ এই সন্দর্ভটির প্রকাশের পরে পরেই আডার স্বাস্থ্য গভীর সংকটে পড়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য তিনি নানাবিধ ওষুধের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকেন। আডার জীবন নানা জটিলতার আবর্তে পড়ে গেল। এই সময় তাঁর হাতে আর কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজ নেই। এমনকি বৈজ্ঞানিক কাজ করবেন, এমন কোনো ধীশক্তিসম্পন্ন বন্ধুবান্ধব পর্যন্ত কাছে নেই।

The first algorithm...happy birthday Ada Lovelace! - Simcenter

এই প্রকৃত বন্ধুহীনতাই তাঁকে আরো বিপদের মধ‍্যে ঠেলে দিল। লেখা প্রকাশ ব‍্যাপারটা আডার নিজেরই খুব ভাল লেগেছিল। তিনি আশা করছিলেন, আরো অনেক গাণিতিক গবেষণা করবেন। নিজের এমন আকুতির কথা তিনি অনেক শুভানুধ্যায়ীকে চিঠিতে লিখেছিলেন। আডা ভেবেছিলেন ওই নোটস এর আঙ্গিকেই জার্মান তড়িৎ বিজ্ঞানসাধক জর্জ সাইমন ওহম (১৬ মার্চ ১৭৮৯ - ৬ জুলাই ১৮৫৪) এর গবেষণাপত্র অন গ‍্যালভানিক সিরিজ নিয়ে পুনর্নিরীক্ষণ করবেন। কিন্তু সে আর হয়ে উঠল না। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে লাভলেস বিজ্ঞান গবেষক ডি মরগ‍্যানের স্ত্রীকে লিখেছিলেন, আমি এখন পড়াশুনায় সেভাবে মনোযোগ দিতেই পারছি না। গতকাল নিজেকে টেনেবুনে খানিকটা গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। দিনে যদি অন্ততঃ এক আধ ঘণ্টাও পড়াশুনা করতে পারি, তাহলেও তো খানিকটা উপকার হয়। দয়া করে আমার শিক্ষক মরগ‍্যান সাহেবকে একটু বুঝিয়ে বলবেন। কেননা, আমি তাঁকে এসব বলিনি ভেবে হয়ত তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন।১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে, যে বছরের ২৭ নভেম্বরে আডা শেষ নিঃশ্বাস ত‍্যাগ করবেন, সেই বছরের গোড়ায় জানুয়ারিতে তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন, ক‍্যানসার দুর্নিবার বেগে তাঁর সমস্ত শরীরে স্নায়ুতে শিরায় দৌড় লাগিয়েছে, সেই সময়েও তাঁর মন বিজ্ঞান বিষয়ে তীক্ষ্ণ ও সক্রিয় ছিল। আডার স্বামী উইলিয়াম কিং লিখেছেন, উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিভাবান মানুষের সংসর্গে আডা খানিকটা স্ফূর্তি পেতেন বলে, আমরা মাঝেমাঝে প্রখ‍্যাত সব বুদ্ধিজীবীদের আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতাম। আডা গৃহকর্ত্রী হিসেবে তাঁদের আরাম আয়েসের উদ‍্যোগ নিতেন। আডা কোনো একটা প্রশ্নকে নিয়ে গাণিতিক দিক থেকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনায় অসামান্য পারদর্শী ছিলেন। কতকগুলি তথ‍্য জানতে পারলে সেগুলি সংশ্লেষণ করে খুব দ্রুত তার মধ‍্য থেকে সাধারণীকৃত একটি তত্ত্ব তিনি দাঁড় করাতে পারতেন। মনে মনেই অতি দ্রুত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জটিল গণনা করে উঠতে না পারলে তেমন সাধারণীকরণ করতে পারাটা কঠিন।
শেষপর্যন্ত স্বামীর ভালবাসা পেয়েই জীবনাবসান হয়েছে আডার। আর মৃত‍্যুর পরে কবরের ঠাণ্ডা মাটিতে শুয়ে শুয়ে অসামান্য দুই বাপ মেয়ে অপূর্ব কাব‍্যিক ভাবনার কথা দেয়ানেয়া করতেন কিনা সেসব জানে শুধু হলুদ ঘাসেরা।

মৃদুল শ্রীমানী- ডেপুটি ম‍্যাজিস্ট্রেট

Latest