Skip to content

বছরের এই একটা সময়েই পাওয়া যায় দূর্গাছাতু, আলাদা আবেগে জঙ্গলমহলে!

সুমন পাত্র : নামী-দামী শপিং মল থেকে শুরু করে শহুরে শপিং মল আজকাল হইচই চলে বাটন মাশরুম নিয়ে। মাশরুমের উপকারিতা অনেক। বর্তমানে এই মাশরুমের উপকারিতা নিয়ে অনেক রকম লেখালেখিও চলে। তবে জঙ্গলমহলে এই সময় বাজারে আরও একরকম ছাতু ওঠে,যা দূর্গাছাতু বা কুড়কুড়ে ছাতু বা কাড়ান ছাতু নামেই পরিচিত। বাজারে ওঠা মাত্রই পড়ে যায় এই ছাতু আলাদা আবেগ। বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহল এবং অখণ্ড মেদিনীপুরের একাংশই এই ছাতুর সঙ্গে পরিচিত। দের স্বাদও একেবারে অন্যরকম তাই সব মানুষের কাছে অত্যন্ত পছন্দের । সাধারণত আষাঢ়, শ্রাবণ মাসে মানে বর্ষাকালে কুড়কুড়ে ছাতু বাজারে পাওয়া যায়। পরপর দু-তিন দিন বৃষ্টির পর যদি টানা রোদ দেয় তাহলে শাল জঙ্গলে, কুড়কুড়ে ছাতু বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়।

লাল মাটির শাল জঙ্গলের আর্দ্র পরিবেশে এই ছাতু জন্মায়। আর সারা বছর ধরেই মোটামুটি পুয়াল ছাতু বা খড় ছাতু পাওয়া যায়।এই ছাতু প্রকৃত অর্থে বন্য ছাতু নয়। পুরানো খড়ের গাদায় এই ছাতু দু-একটা দেখা যায়, তাই একে ছাতু (Volvaria volvacea) বলে। গোয়ালঘর পরিস্কারের সময় গবাদি গরুর না খাওয়া খড় গোবরের সাথে বাড়ির গোবর গাদায় ফেলে দেওয়ার কারণে সেখানেও এই ছাতু ফোটে। অনেকসময় পুরানো খড়ের চালের উপরেও খড় ছাতু বা পুয়াল ছাতু পাওয়া যায়। এই ছাতুটি প্রধানত বর্ষাকালে পাওয়া যায়। অন্যান্য ভোজ্য ছাতুর মতোই পুয়াল ছাতু রোদ উঠোলে নষ্ট হয়ে যায়। তাই এই ছাতুটিকে খুব সকালবেলা গাদা থেকে তুলে আনতে হয়।বর্ষার শেষের দিক থেকে দুর্গা পূজার আগে পর্যন্ত কাড়ান ছাতু পাওয়া যায়। এটিকে দুগ্গা ছাতুও বলা হয়। শরতের এই সময়টাতেই জঙ্গলে মেলে কাড়ান বা দুর্গা ছাতু। জীতাষ্টমীর সময় থেকে খাওয়া শুরু হয়। খাওয়া ধুম পড়ে দুর্গা পুজোর অষ্টমী থেকে ত্রয়োদশী পর্যন্ত, ঠিক দূর্গা পূজার সময় তাই এর নাম দূর্গাছাতু হয়তো।মূলত লাল মাটিতে গাছের ছায়ায় এই ছাতু জন্মায়। শরতের শেষের আবহাওয়াতেই ছাতুটা হয়।

এতে প্রচুর প্রোটিন থাকে। অন্যান্য Termitomyces ছাতুর মতো উইঢিবির সাথে এই ছাতুর বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। উই ঢিবি এবং তার আশেপাশের ল্যাটেরাইট মাটির উপর বেশিরভাগ সময় বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটি ভেদ করে সাদা হয়ে ফুটে থাকে। এরকম জায়গা যেখানে কাড়ান ছাতু ফুটে থাকে সেগুলিকে জঙ্গলমহলের ছাতু কুড়ানিরা 'আড়া' বলে থাকে। একটি ছাতুর আড়াতে প্রতিবছর ছাতু পাওয়া যায়। অভিজ্ঞ ছাতু কুড়ানিরা তাই এইসব আড়াগুলি চিনে রাখে। এই ছাতুর লম্বা ডাঁটাটি সম্পূর্ণ তুলে আনা সম্ভব হয়না, সবসময় গোড়ার দিকের কিছু অংশ ছিঁড়ে মাটিতে রয়ে যায়। এই ছাতু তিন দিন ধরে নির্দিষ্ট আড়া ও তার পাশাপাশি জায়গায় পাওয়া যায়। প্রথম দিন ছাতুটি কুড়ি অবস্থায় পাওয়া যায়, দ্বিতীয় দিনে অর্ধফোটা ও তৃতীয় দিনে ছাতু পুরো ফুটে ছাতার মতো আকার নেয়। কাড়ান ছাতুর মরসুমে শেষ রাতে দিনের আলো ফোটার আগে অন্ধকারে হিমের চাদর জড়িয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে ছাতু সন্ধানীরা। মরসুমে কিছু টাকার আশায়। বছরের একটা বাড়তি রোজগারের উৎস হওয়ায়, এই ছাতুকে জঙ্গলবাসীরা কেউঅবহেলা করতে চায়না। সাধারণভাবে মরশুমে ছাতু তুলতে ভোর চারটে থেকেই মানুষ জঙ্গলে উপস্থিত হয়ে যায়। পুরুষ, মহিলা এমনকি খুদে বাচ্চারাও ছাতু সংগ্রহের ব্যাপারে সক্রিয়। তবে মহিলাদেরই এ ব্যাপারে ভূমিকা বেশী। সাধারণত পাড়াপড়শীর মেয়েরা ছোট ছোট দল করে রাত থাকতেই জঙ্গলে হাজির হয়। হাতে থাকে ঝুড়ি বা ছোট থলে। কখনও আঁচলে বা গামছার খুঁটে বেঁধে নিয়ে আসে জঙ্গলের ধন। আগের রাত্রে বৃষ্টি হলে সংগ্রহকারীদের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়।

দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি হলে অনেকে বিকেলের দিকেও ছাতু সংগ্রহ করে। শুধু বয়স্করাই নয়, এখানকার ছোট বাচ্চারাও খাবার ছাতু ভালোভাবেই চেনে।পরিণত ছাতুটি দেখতে সাদা রঙের ছাতার মতো। সাদা রঙের মাঝখানের উপরিতল কিছুটা কালচে ধূসর রঙের। টুপির নিম্নাংশ অনেক গিলযুক্ত যা একটা সাদা রঙের দীর্ঘ বৃন্ত বা ভাঁটার (স্টাইপ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাটির নিচ অবধি বিস্তৃত গ্রাম্য ভাষায় যাকে সিক বলে। এইজন্য অনেকে সিক ছাতু বলে থাকে। তবে বর্তমান সময়ে বিরূপ আবহাওয়া, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, জঙ্গলের আগুন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে কাড়ান ছাতুর পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে। ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে কাড়ান ছাতুর আবাস শাল, মহুল জঙ্গলের পরিসর।


Latest