Skip to content

রাজনীতির ‘অন্নপ্রাশন’ কি গ্রাস করছে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ---দেবরাজ সাহা

রাজনীতি, ভোট আর দলীয় বিভাজনের কঠিন বাস্তবতা—এই তিনের সংমিশ্রণে কি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক নতুন প্রজন্ম, যারা ভাবতে শেখার আগেই হয়ে উঠছে নিছক ভোটযন্ত্র?সমাজের আগামী ভবিষ্যৎ যে যুবসমাজ, তাদের প্রথম শিক্ষা, প্রথম চেতনা আর প্রথম আদর্শ নিয়েই এখন উঠছে বড় প্রশ্ন। আজকের বাস্তবতায় কি সেই ‘প্রথম পাঠ’ হয়ে উঠছে রাজনীতি, ভোটের অঙ্ক আর দলীয় বিভাজনের কৌশল? এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষামহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে।অন্নপ্রাশন—একটি শিশুর জীবনের প্রথম খাদ্যগ্রহণ, যা শুধু শরীর নয়, ভবিষ্যতের ভিত্তিকেও প্রতীকীভাবে নির্মাণ করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রতীকী ‘অন্নপ্রাশনের থালা’য় জ্ঞান, সংস্কৃতি বা মানবিকতার জায়গা ক্রমশ কমছে, আর তার জায়গা নিচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয় ও বিভাজনের বাস্তবতা। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক তরুণ-তরুণীর সামনে প্রথম প্রশ্ন—“তুমি কোন দলে?”। এর ফলে তাদের মেধা, চিন্তাশক্তি বা সৃজনশীলতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক অবস্থান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র, অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মঞ্চে।বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও একই চিত্র স্পষ্ট। ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক পড়াশোনা, থমকে দাঁড়ায় শিক্ষার গতি। অভিযোগ, নবীনদের জোর করে মিছিলে টেনে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ভিন্ন মত প্রকাশ করলেই হেনস্থার ঘটনাও ঘটছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র, অনেক সময় পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মঞ্চে।আরও এক বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ তাদের রাজনৈতিক ধারণা গড়ে তোলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু সেই তথ্যের বড় অংশই যাচাইহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ায়, না বুঝেই অনেকেই একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রচারক হয়ে উঠছে। এতে সংকুচিত হচ্ছে স্বাধীন চিন্তার পরিসর।তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনীতি নিজে কোনো সমস্যা নয়—বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। সমস্যা তখনই, যখন তা অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়। ইতিহাসই প্রমাণ করেছে, প্রশ্নহীন সমাজ একসময় অন্ধকারে তলিয়ে যায়।এই প্রেক্ষিতে প্রয়োজন ভারসাম্য—রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি যুক্তিবোধ, মতাদর্শের সঙ্গে সহনশীলতা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। এই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবার। এমন শিক্ষা প্রয়োজন, যা শেখাবে কী ভাবতে হবে নয়, বরং কীভাবে ভাবতে হবে। পরিবারের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্ব বর্তায়। অভিভাবকদের নিজেদের মত চাপিয়ে না দিয়ে সন্তানের স্বাধীন চিন্তার বিকাশে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।সবশেষে প্রশ্নটা থেকেই যায়—যুবসমাজকে আমরা কী দিচ্ছি? যদি তাদের সামনে তুলে ধরি বিভাজন আর অন্ধ আনুগত্য, তবে ভবিষ্যৎও তেমনই হবে। আর যদি তুলে ধরি জ্ঞান, মানবিকতা ও যুক্তির আলো, তবে সেই যুবসমাজই একদিন সমাজকে নতুন পথ দেখাবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত যুবসমাজকে শুধুমাত্র ভোটার হিসেবে না দেখে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের দিকে গুরুত্ব দেওয়া।কারণ আজকের যুবকরাই আগামী দিনের সমাজ নির্মাতা। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সত্যিই মানুষ গড়ে তুলছি, নাকি কেবল ভোটার তৈরি করছি?

Latest