মিন্টু চৌধুরী : বাংলা ভাষার প্রধান উৎস হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা। আরও সহজভাবে বললে সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। আর সেই সংস্কৃত ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হলেন মহাকবি কালিদাস। প্রাচীন ভারতেরও তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। এটাই কালিদাস পণ্ডিতের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তবে আমাদের সাথে কালিদাস পণ্ডিতের পরিচয়টা হয়ত ঘটেছে অন্যভাবে। আর সেটা হচ্ছে ‘ধাঁধাঁ’। বর্তমানে ধাঁধাঁর প্রচলন কমে গেলেও আমাদের বাল্যকাল কেটেছে মজার মজার ধাঁধাঁর খেলায়।

আর কালিদাসের ধাঁধাঁ ছাড়া যেন ধাঁধাঁর আসর জমতোই না। যেমন, কালিদাস পণ্ডিতে কয় বাল্যকালের কথা/ নয় হাজার তেঁতুল গাছে কয় হাজার পাতা? কিংবা, কালিদাস পন্ডিতের ফাঁকি/ আড়াইশ থেকে পাঁচ পঞ্চাশ গেলে/ আর কত থাকে বাকী? যদিও এসব ধাঁধাঁ আদৌ কালিদাস পণ্ডিতের কিনা তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে, তবে এতটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি প্রতিভাধর ছিলেন বিধায়ই তার নামে এসব ধাঁধাঁ প্রচলিত হয়ে আসছে।

বিহার জেলার উজ্জয়নী নদী যা বর্তমানে মরা মহানন্দা নদী নামে পরিচিত, তার পাশেই একটি বট গাছের নিচে বসেই তিনি তপস্যা শুরু করেন। যুগের পর যুগ ধরে দেবী সরস্বতীর তপস্য মগ্ন ছিলেন মূর্খ কালিদাস। কালিদাসের তপস্যয় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাকে জ্ঞান বর প্রদান। সেদিন থেকে মুর্খ কালিদাস মহাকবি কালিদাস নামে পরিচিতি পায়। যে বট গাছটির নিচে তিনি বসেছিলেন সেটি কমপক্ষে ১২০০ বছর প্রাচীন।

কালিদাস বিক্রমাদিত্য নামে পরিচিত এক গুপ্ত সম্রাটের সভাকবি ছিলেন। কালিদাসের অনেক রচনায় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য, রাজধানী উজ্জয়িনী ও রাজসভার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানেও সমস্যা হচ্ছে, ‘বিক্রমাদিত্য’ নাম দ্বারা আসলে সুনির্দিষ্ট কিছু বোঝার উপায় নেই। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে অন্তত ছয়জন রাজা ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। ফলে, আমাদের জন্য কালিদাস সম্বন্ধীয় বিক্রমাদিত্যকে খুঁজে বের করাও বেশ কঠিন কাজ। তবে অধিক প্রচলিত মত হচ্ছে, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সর্বাধিক খ্যাতিমান নৃপতি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, যার উপাধি ছিল ‘বিক্রমাদিত্য’, তার সভাকবি ছিলেন কালিদাস। আর এই রাজার রাজত্বকাল ছিল ৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪১৪ খ্রিস্টাব্দ। তারপরেও মূল কথা হচ্ছে, কালিদাস কবে জন্মেছিলেন সেই তথ্য কেউই সঠিক ভাবে বলতে পারবে না। তাই আমরা সেসব তর্ক থেকে নাহয় দূরেই থাকলাম।

তবে মজার ব্যাপার হলো কালিদাস বাস্তবে একজন অশিক্ষিত-মূর্খ মানুষ ছিলেন। নিজের স্ত্রীও তার বোকামি নিয়ে হাসি-তামাশা করত। রাগে ক্ষোভে তিনি একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। কথিত আছে, এমতাবস্থায় তিনিও দস্যু রত্নাকরের মতো ‘কালি দেবী’র মতান্তরে সরস্বতীর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন। এতেই মূর্খ কালিদাস হয়ে উঠলেন মহাকবি কালিদাস!

ছোটবেলায় বাবা-মা হারান কালিদাস। সর্বহারা শিশু কালিদাসের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাখাল গোত্রের লোকজন। রাখালদের কাছে লালিত-পালিত হওয়ায় কালিদাসের লেখাপড়ার কোনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তিনি দেখতে-শুনতে ছিলেন খুবই সুদর্শন। এতটাই সুদর্শন ছিলেন যে তাকে রাজপুত্রের মতো লাগত। আর সে কারণেই তার বিয়ে হয় এক সুন্দরী রাজকন্যার সঙ্গে। এ বিয়ে নিয়েও একটি মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। কথিত আছে, উক্ত রাজকন্য নাকি রাজার খুবই অবাধ্য ছিলেন, তাই মন্ত্রীর পরামর্শে রাজা তার কন্যাকে শায়েস্তা করার জন্য কালিদাসের সাথে বিবাহ দিয়ে দেন।

রাজপুত্রের মতো চেহারা থাকলেও বাস্তবে কালিদাস ছিলেন লেখাপড়া না জানা এক মূর্খ যুবক। নিজের ভাল-মন্দ বিচার করার মতো ক্ষমতাও ছিল না তার। একদিন কিছু লাকড়ির দরকার হলে কালিদাস গাছে উঠে গাছের যে ডালে বসে আছেন সেই ডালটিই কাটতে শুরু করলেন। উক্ত গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় এক পথিক কালিদাসের এমন বোকামি দেখে তাকে ডাল কাটার সঠিক উপায় বলে দিলেন, কিন্তু কালিদাস এতটাই মূর্খ ছিলেন যে, ঐ পথিকের পরামর্শও তিনি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। ডাল কাটতে গিয়ে ডালের সাথে কালিদাস নিজেও মাটিতে পড়ে আহত হন। বোকামির এমন সংবাদ সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

এমনিতেই বোকামির জন্য কালিদাস প্রতিদিন স্ত্রীর কাছে বকা-ঝকা শুনতেন। ডাল কাটার বোকামি যেন তা আরও উস্কে দিল। স্ত্রীর এমন ব্যবহারে কালিদাস একদিন রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে ঘর থেকে বের হয়ে আত্মহত্যা করার জন্য নদীতে ঝাপ দিলেন। কিন্তু তিনি সেখানেও ব্যার্থ। নদী থেকে তাকে উদ্ধার করলেন দেবী কালি, আর সেই কৃতজ্ঞতায় তিনি হয়ে গেলেন দেবীর ‘কালি’র দাস। সে অনুসারেই তার নাম হয়ে গেল কালিদাস। শুধু যে দেবী কালি তার জীবন বাঁচালেন তা-ই নয়, তাকে দিলেন জ্ঞান ও বুদ্ধির আশীর্বাদ, তাতেই কালিদাস হয়ে উঠলেন মহাকবি। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকির দস্যু থেকে সাধক হয়ে ওঠার গল্পের মতো কালিদাস মূর্খ থেকে হয়ে উঠলেন মহাকবি। তার বুদ্ধির তারিফ করতে গিয়ে তার নামে আজও প্রচলিত আছে হাজার হাজার জটিল ধাঁধাঁ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। কালিদাস দুটি মহাকাব্য লিখেছেন- ‘রঘুবংশম্’ এবং ‘কুমারসম্ভবম্’। নাটক রচনা করেছেন তিনটি- ‘বিক্রমোর্বশীয়ম্’, ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ আর ‘অভিজ্ঞানশকু্ন্তলম্’। গীতিকাব্য লিখেছেন দুটি- একটি হলো ‘মেঘদূতম্’, যাকে আমরা বাংলায় ‘মেঘদূত’ বলে জানি এবং অন্যটির নাম ‘ঋতুসংহারমা’।

প্রতি মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে উজ্জয়নী বা মরা মহানন্দা নদীর পাশে ওই মন্দিরে ধুমধাম করে বাগ্দেবীর পুজোর আয়োজন করা হয়। সরস্বতী পূজোয় মেতে ওঠেন বাংলা বিহার উভয় রাজ্যের হাজার হাজার মানুষ।দেবি সরস্বতীর বরে একের পর এক স্লোক, কাব্য, গীতি রচনা করেন মহাকবি কালিদাস। আর মহাকবি কালিদাসের সেই সাধন ক্ষেত্র হলো এই বেলুয়ার এই মন্দির। সরস্বতী পুজো উপলক্ষে এখানেই বসবে বিশাল মেলা। শিশুদের হাতে খড়ি দেওয়ার জন্য পড়বে লম্বা লাইন। ইতিমধ্যে তার প্রস্তুতি তুঙ্গে। সরস্বতী পুজোর দিন সেই বটগাছে পড়ুয়ারা নিজেদের মনবাসনা পূরণের জন্য মানসিক করেন। আর এভাবেই মূর্খ কালিদাস থেকে মহাকবি কালিদাস হয়ে ওঠার ইতিহাসটা আরও পুরোনো হবে।