নিজস্ব সংবাদদাতা : কাজের বেলায় চরম উদাসীনতার পরিচয় দিল নামী ফুড জায়েন্ট ‘ওয়াও মোমো’। বাইপাস লাগোয়া নরেন্দ্রপুর থানার আনন্দপুরের প্রত্যন্ত এলাকা নাজিরাবাদের জলাজমিতে দমকলের অনুমতি ছাড়াই তৈরি হয়ে গিয়েছিল কারখানা। প্রশাসনের নজরদারির আড়ালে ব্যবসা তরতরিয়ে বেড়ে উঠবে, এমনটাই বোধহয় ভেবেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিপদ যখন আসে, কাউকে রেয়াত করে না। পাশের গুদামে লাগা আগুন দ্রুত গ্রাস করে ফেলে ওয়াও মোমোর কারখানাকেও। অফিসিয়াল হিসেবে মৃত ১৬, নিখোঁজ ৩০। আসলে মৃতই প্রায় ৫০ জন শ্রমিক। বাইরে থেকে বন্ধ কারখানার ভেতর থেকে অদৃশ্য হওয়ার হুডিনি-প্রতিভা শ্রমিকদের নেই। কারখানার দমকল বিভাগের ছাড়পত্র ছিল না। মালিক চুরি ঠেকাতে রাতে কারখানার ভেতর ৫০ জন শ্রমিককে রেখে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ রেখেছিলেন শোনা যাচ্ছে। যদিও ঘটনার দেড়দিন পর কারখানার সুপারভাইজার ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে জবাব দিলেন, ”এখানে বেআইনি কিছু হচ্ছিল না।” তবে যে দমকলের ডিজি নিজে জানিয়েছেন নরেন্দ্রপুর থানায় অভিযুক্তর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে । স্থানীয়দের দাবি আরও বিস্ফোরক। মোমো তৈরির কারখানার আড়ালে চলত অবৈধ কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরির কাজ।

সেই কারণেই প্রচুর দাহ্য পদার্থ মজুত করা ছিল বলে অভিযোগ। এমনকি জলাশয় বুজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল গোডাউন, এই অভিযোগও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে নাজিরাবাদে গিয়ে অনেক কিছুই জানা গেল। নামী মোমো প্রস্তুতকারক সংস্থার ওই কারখানায় তিনটি রান্নাঘর ছিল। প্রথমটিতে রান্না হতো না। সেখানে হতো প্যাকেজিংয়ের কাজ। দুই এবং তিন নম্বর রান্নাঘরে রান্না হতো। রবিবার রাতে তিন নম্বর রান্নাঘর থেকে যখন আগুন ছড়ায়, তখন ঘুমোচ্ছিলেন সকলে। প্রথম রান্নাঘর পেরিয়ে মূল দরজা খুলে বেরতে চেয়েও পারেননি। আগুন থেকে বাঁচতে অসহায় শ্রমিকদের আকুতি পর্যবসিত হয়েছিল ‘ব্যর্থ পরিহাসে’। ফলস্বরূপ কারখানা থেকে উদ্ধার হয়েছে দগ্ধ মৃতদেহ, এখনও কতজন যে নিখোঁজ, তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই প্রশাসনেরও।

আমরা এর পরেও ওয়াও মোমোর মোমো খাব তারিয়ে। বা হয়তো খাব না। অক্ষম আক্রোশে বয়কট করব কিছুদিন, কেউ কেউ হয়তো চিরতরে। ব্যাস। ওটুকুই সাধ্য। ওটুকুই বিপ্লব। আর অন্য অন্য কারখানায় এভাবেই রাত কাটাবেন শ্রমিকরা 'দুর্ঘটনা'র শিকার হওয়ার অপেক্ষায়।দেশের মধ্যে অন্যতম বড় ফুড জায়েন্টের নাম এখন ‘ওয়াও মোমো’। ব্যবসা তাদের দিনদিন ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিন্তু সবই কি অসদুপায়ে? নাজিরাবাদে সংস্থার ছাই হয়ে যাওয়া কারখানা এই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে? প্রান্তিক মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমে তৈরি হয় সুস্বাদু সব মোমোর পদ। চড়া দামে বিক্রি হয় গোটা দেশজুড়ে। ‘হীরক রাজার দেশ’-এ হীরার খনির শ্রমিকদের মতোই এঁদের জীবন। সুস্বাদু খাবার তৈরি করলেও নিজেরা সেসবের স্বাদ পাননি কস্মিনকালেও। শুধু দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটাতে মেদিনীপুর থেকে এসেছিলেন এসব শ্রমিকরা।