নিজস্ব সংবাদদাতা : এ যেন রূপকথার গল্প। মেদিনীপুরের রেলকর্মী সমীর দেব সিংহ-এর সৌজন্যে প্রায় এগারো দিন পরে নথিপত্র সহ খোয়া যাওয়া মাণিপার্স ফেরত পেলেন মুর্শিদাবাদের খড়গ্রামের পরিযায়ী শ্রমিক সোমনাথ মন্ডল। এস আই আর এর ফরম পূরণের জন্য গত ১৭ ই নভেম্বর নিজের কর্মস্থল চেন্নাই-থেকে মুর্শিদাবাদের খড়গ্রাম এলাকায় নিজে বাড়িতে ফিরছিলেন বছর ৩৫ এর পরিযায়ী শ্রমিক সোমনাথ ঘোষাল ।ট্রেনযাত্রার খড়্গপুর এলাকায় পটেকমার হয়ে যায় তাঁর মাণিপার্শ। তাঁর মাণিব্যাগের মধ্যেই ছিল ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, একাধিক এটিএম কার্ড-সহ যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। খড়্গপুর স্টেশনে নেমে হাওড়াগামী ট্রেন ধরা মাঝেই এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর কোনওমতে বাড়ি পৌঁছলেও দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারেন নি সোমনাথ। বিভিন্ন ভাবে মানি পার্স খোঁজার চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু কোন ভাবেই কোন সুরাহা করতে পারেন নি।আর এরপর রূপকথার গল্পের মতো এক আশ্বর্য ঘটনা হঠাৎই ঘটলো। মিরাকল সৃষ্টি হলো। বৃহস্পতিবার একটা ফোনই এক প্রকার সব ‘দুশ্চিন্তা’ দূর হলো সোমনাথের। সেই ফোনের সূত্র ধরে মুর্শিদাবাদ থেকে মেদিনীপুরে এসে শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের নথিপত্র সহ ব্যাগ ফিরে পেলেন সোমনাথ।আর এই রূপকথার গল্পের নায়ক হলেন খড়্গপুর ডিভিশনের অধীন খড়্গপুর ও মেদিনীপুর স্টেশনের মাঝে গোকু্লপুর স্টেশনে কর্মরত রেল সমীর দেব সিংহ। সমীর বাবুর সৌজন্যেই সবকিছু ফিরে পেলেন সোমনাথ। দিন কয়েক আগে নিজের ডিউটি সমীর মেদিনীপুর শহরের জুগনুতলা জজকোর্টের রাস্তায় কুড়িয়ে পান একটি মানিব্যাগ। না, সেই পার্সের মধ্যে কোন টাকাপয়সা না থাকলেও ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, তিনটি এটিএম কার্ড এবং একাধিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি ছিল। ওই সব নথিতে সোমনাথের ফোন নম্বর না থাকলেও সমীর হাল ছাড়েনি।তিনি বিভিন্ন ভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকেন।এর খড়গ্রামের ঠিকানা ধরে গুগল সার্চ করে, এক চিকিৎসকের সাইনবোর্ড খুঁজে পান সমীর। ওই সাইনবোর্ডে চিকিৎসকের ফোন নম্বরও দেওয়া ছিল। তাঁকে ফোন করে ঠিকানা বলতেই ওই মহিলা চিকিৎসক জানান, সোমনাথ মন্ডল দের বাড়ি তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার ।তবে তিনি দ্রুত সোমনাথের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) মহিলা চিকিৎসকের সৌজন্যে সোমনাথের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয় সমীরের। শুক্রবার ভোরে খড়গ্রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে (২৮ নভেম্বর) প্রায় ১৭ ঘণ্টা জার্নি করে সন্ধ্যায় মেদিনীপুর স্টেশনে এসে পৌঁছন সোমনাথ। স্টেশনেই অপেক্ষা করছিলেন সমীর।সেখান থেকে সমীর সোমনাথ বাবুকে নিয়ে সরাসরি চলে যান শহরের উদয় পল্লীতে মেদিনীপুর কুইজ কেন্দ্র পরিচালিত মস্তি কি পাঠশালায়। সেখান কুইজ কেন্দ্রের সদস্যদের উপস্থিতিতে সোমনাথ মন্ডলের হাতে মানিপার্শ সহ সমস্ত নথিপত্র তুলে দেন সমীর। কুইজ কেন্দ্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কুইজ কেন্দ্রের সভাপতি রিংকু চক্রবর্তী, সদস্য সুদীপ কুমার খাঁড়া, সুভাষ জানা,সৌনক সাহু, শুভরাজ আলি খাঁন প্রমুখ। নিজের সবকিছু ফিরে পেয়ে খুশিতে একপ্রকার চোখে জল চলে আসে সোমনাথের। সোমনাথ বলেন, ‘বাড়ি ফিরছিলাম এস আই আর-এর ফর্ম পূরণের জন্য। চেন্নাই থেকে খড়গপুর স্টেশনে নেমে হাওড়া যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরেছিলাম। এই সময়ের মধ্যেই মানিব্যাগটি বোধহয় চুরি হয়ে যায়। ট্রেনে খাবার কিনতে গিয়ে দেখি মানিব্যাগ নেই' হাল এক প্রকার ছেড়ে দিয়েছিলেন সোমনাথ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওই মহিলা চিকিৎসক ফোন করে সমীরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পরে স্বস্তি ফেরে সোমনাথের। শুক্রবার ভোরে মুর্শিদাবাদ থেকে মেদিনীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন সোমনাথ। শুক্রবার রাত হয়ে যাওয়ায় সোমনাথকে আর বাড়ি ফিরতে দেন নি সমীর। নিজের কোয়ার্টারেই অতিথি হিসেবে রেখে দেন সোমনাথ কে। শনিবার সকালে হাওড়াগামী 'রানী শিরোমণি' ট্রেনে সোমনাথকে উঠিয়ে দেন সমীর। বাড়ী পথে পা বাড়ানোর আগে সোমনাথ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যান সমীরবাবু তথা মেদিনীপুরকে। সমীরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন কুইজ কেন্দ্রের সদস্যরা ও সমীরের শুভানুধ্যায়ীরা। উল্লেখ্য দিন কয়েক আগে এভাবেই মানি ব্যাগ কুড়িয়ে পেয়ে ফেরত দিয়েছিলেন সমীর বাবুর অনীক মাহাতো।