ঐতিহ্য, আবেগ আর মহানায়কের স্মৃতি—উত্তম কুমারের বাড়ির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় আজও অমলিন আভিজাত্য!
নিজস্ব সংবাদদাতা : ইট, কাঠ, সিমেন্ট আর বালির তৈরি একটি বাড়ি। কিন্তু সেই বাড়ির প্রতিটি কোণে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তির স্মৃতি, আবেগ ও ইতিহাস। ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডে মহানায়ক উত্তম কুমারের বাড়ি শুধু একটি বাসস্থান নয়, তাঁর অনুরাগীদের কাছে যেন এক তীর্থস্থান। এখানেই এক সাধারণ যুবকের অসাধারণ হয়ে ওঠার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে পরিবারের কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও সেই ঐতিহ্য মেনেই ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হল দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা।এই পুজোকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততা থাকে চোখে পড়ার মতো।

বিশেষ করে অভিনেত্রী দেবলীনা কুমারের কাছে লক্ষ্মীপুজো মানেই বাড়তি দায়িত্ব। একদিকে মহানায়ক উত্তম কুমারের নাতবউ, অন্যদিকে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমারের একমাত্র সন্তান—দুই পরিবারের পুজোর আয়োজনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। শুধু বাপেরবাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি নয়, নিজের নাচের স্কুলেও দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার ব্যবস্থা করেন অভিনেত্রী।

ফলে তিনটি পুজোর প্রস্তুতি সামলাতে তাঁকে যথেষ্ট ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে প্রতিটি আয়োজনেই থাকে তাঁর বিশেষ যত্ন ও নিষ্ঠা।এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে পুজোর নানা মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছেন দেবলীনা। মহানায়কের বাড়ির পুজোয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পারিবারিক আবেগের মেলবন্ধন যেন আরও একবার ধরা পড়েছে তাঁর ভাগ করে নেওয়া ঝলকে।

১৯৫০ সালে শুরু, আজও অটুট পারিবারিক পরম্পরা : প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের চট্টোপাধ্যায় পরিবারে শুরু হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। সেই বছরই জন্ম হয় উত্তম কুমারের ছেলে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের। শোনা যায়, অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো দেখে নিজের বাড়িতেও দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন মহানায়ক। সেই ইচ্ছা থেকেই এই পুজোর সূচনা।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। মহানায়ক উত্তম কুমার আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে থাকা এই পুজো থেমে যায়নি। বছরের পর বছর ধরে পরিবারের সদস্যরা একই নিষ্ঠায় পুজোর আয়োজন করে চলেছেন। মহানায়কের মৃত্যুর পরেও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ফলে এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পরিবারের ইতিহাস ও উত্তরাধিকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গঙ্গার জল, রুপোর ঘট আর সাবেকি আচার : মহানায়কের বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল প্রাচীন রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, পুজোর দিন ভোরে গঙ্গায় স্নান করে জল নিয়ে আসার রীতি রয়েছে। সেই জল দিয়েই পুজোর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়। উত্তম কুমারের সময় থেকেই প্রতিমার সামনে একটি বড় রুপোর ঘট রাখার প্রচলন রয়েছে।পরিবারের প্রবীণদের স্মৃতিতে রয়েছে আরও একটি বিশেষ অধ্যায়।

মহানায়কের স্ত্রী গৌরীদেবী নিজের গয়না দিয়ে দেবীকে সাজাতেন বলে জানা যায়। সেই সাজসজ্জার মধ্যে ছিল পারিবারিক আবেগ ও ভক্তির গভীর প্রকাশ। দেবীকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো করে সাজিয়ে তোলার এই রীতি পুজোর বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল।

ভোগের আয়োজনে সাবেকি বাঙালিয়ানা : দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভোগের আয়োজনও বিশেষ গুরুত্ব পায়। মহানায়কের বাড়ির পুজোতেও তার ব্যতিক্রম নেই। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী, দীক্ষিত পরিবারের মেয়ে বা পুত্রবধূরাই ভোগ তৈরির দায়িত্ব পালন করেন।ভোগের তালিকায় থাকে পোলাও, লুচি, ছোলার ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, ফুলকপি, বাঁধাকপি এবং পায়েসের মতো নানা পদ। একসময় বাড়িতেই ভিয়েন বসিয়ে তৈরি করা হতো পান্তুয়া ও গজা। সেই মিষ্টি বালতি ভরে পাড়াপড়শিদের বাড়িতে বিতরণ করার রীতিও ছিল। ফলে পুজো কেবল পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না, তা ছড়িয়ে পড়ত গোটা পাড়ায়। আর ভোজের আসরে মহানায়ক উত্তম কুমারের উপস্থিতি ছিল সকলের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।

আনন্দ নাড়ুতে রয়েছে আলাদা ঐতিহ্য :বাঙালির লক্ষ্মীপুজো মানেই নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, ক্ষীরের মিষ্টি এবং নানা রকম নৈবেদ্যের আয়োজন। কিন্তু মহানায়কের বাড়ির পুজোয় রয়েছে একটি বিশেষ পদ—আনন্দ নাড়ু। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী, এই নাড়ুর গুরুত্ব অন্যান্য প্রচলিত নাড়ুর তুলনায় আলাদা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই বিশেষ খাবার পুজোর সাবেকি ঐতিহ্যকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

কোজাগরীর রাতে লক্ষ্মী আরাধনা : বাংলার ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো মানেই আলপনা, ধানের শিষ, নতুন চাল, ফলমূল, নৈবেদ্য এবং দেবীর আরাধনা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে বিচরণ করেন এবং কে জেগে তাঁর আরাধনা করছেন, তা দেখেন। ‘কে জাগে?’—এই লোকবিশ্বাস থেকেই ‘কোজাগরী’ নামটির প্রচলন বলে মনে করা হয়।অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য থাকলেও মূল সুর একই—সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও মঙ্গল কামনা।ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের এই বাড়িতে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে মহানায়ক উত্তম কুমারের স্মৃতি। পুজোর প্রতিটি আচার, ভোগের প্রতিটি পদ এবং পারিবারিক প্রতিটি রীতির মধ্যে যেন ফিরে ফিরে আসেন বাংলা চলচ্চিত্রের সেই অবিস্মরণীয় নায়ক। তাই ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোও শুধু দেবী আরাধনার অনুষ্ঠান নয়, বরং মহানায়কের স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং বাংলার সাবেকি সংস্কৃতিকে নতুন করে অনুভব করার এক বিশেষ উপলক্ষ।