Skip to content

একাকীত্বের অন্ধকারে প্রবীণদের মৃত্যু! আধুনিকতার দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতার স্পর্শ?

সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা ও সম্পর্কের সমীকরণ। কিন্তু এই দ্রুত পরিবর্তনের ভিড়ে কি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা? শহুরে বাস্তব যেন সেই কঠিন প্রশ্নই ছুড়ে দিচ্ছে সমাজের সামনে। হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে মাত্র ৫০ দিনের মধ্যেই একের পর এক প্রবীণের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এই স্বল্প সময়ে ৬৫ থেকে ৯০-৯৫ বছর বয়সি অন্তত ১৮ থেকে ২০ জন প্রবীণ নাগরিকের পচনশীল দেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে আনা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা বাড়িতে সম্পূর্ণ একা থাকতেন। অসুস্থ হয়ে পড়লেও পাশে ছিল না কেউ। মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন কোনও খবর মেলেনি। শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বেরোতে শুরু করলে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দেন। পুলিশের হস্তক্ষেপেই উদ্ধার হয় দেহ। স্থানীয় পরিসংখ্যান বলছে, মৃতদের বড় অংশের ছেলে-মেয়েরা কর্মসূত্রে ভিন রাজ্য বা বিদেশে থাকেন। বাইরে গিয়ে অনেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। কোনও ক্ষেত্রে একমাত্র সন্তান মেয়ে—বিয়ের পর অন্যত্র চলে যাওয়ায় বাবা-মা পড়ে গিয়েছেন একেবারে একা। আবার বহু প্রবীণের জীবনসঙ্গী নেই; স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতার মাঝেই নিঃশব্দে শেষ হয়েছে জীবন। মৃত্যুর খবর জানারও কেউ ছিল না। এ প্রসঙ্গে বিধান নগর কমিশনারেট-এর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত শিবির আয়োজন করা হচ্ছে। নজরদারি ব্যবস্থাও জোরদার হয়েছে। যাতে কেউ অসহায় অবস্থায় একা না পড়েন, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক। চিকিৎসা পরিষেবা ও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবী সংস্থাও এগিয়ে এসেছে। প্রখ্যাত সমাজবিদ অভিজিৎ মিত্র বলেন, “বিষয়টি এক ধরনের পরিহাস। সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়, কিন্তু পরে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে আত্মকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা কমেছে। কোথাও সম্পর্কের টানাপোড়েনে প্রবীণ বাবা-মা হয়ে পড়ছেন ব্রাত্য। ফলে একাকীত্বই তাঁদের জীবনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শারীরিক বা মানসিক সমস্যার খোঁজ নেওয়ার মতো সময় বা আগ্রহ অনেকেরই নেই। প্রতিবেশীরাও অনেক সময় দূরত্ব বজায় রাখেন। আবার বৃদ্ধ দম্পতির একজন মারা গেলে অপরজন সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন—সেখানেও এমন মর্মান্তিক ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।” এই ঘটনাগুলি শুধু পরিসংখ্যান নয়, সমাজের বিবেকের সামনে এক নির্মম আয়না। প্রশ্ন একটাই—উন্নতির দৌড়ে আমরা কি আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকেই হারিয়ে ফেলছি? মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সংযোগ না বাড়ালে এই নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল থামবে কীভাবে?

Latest