Skip to content

দাসপুরের গান্ধী মিশনে আবেগঘন পরিবেশে নারায়ণ ভাইয়ের স্মরণসভা, সমাজসেবার উজ্জ্বল অধ্যায় তুলে ধরলেন বিশিষ্টজনেরা!

নিজস্ব সংবাদদাতা : দাসপুরের গান্ধী মিশনে গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার আবহে অনুষ্ঠিত হল প্রয়াত সাহিত্যপ্রেমী, সমাজসেবী ও গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব নারায়ণ ভট্টাচার্য (নারায়ণ ভাই)-এর স্মরণসভা। তাঁর আজীবন সমাজসেবা, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং মানবিক উদ্যোগের নানা দিক স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও শুভানুধ্যায়ীরা।

স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বজিৎ খোড়াই, গোপাল ঘোষ, দেবাশিষ বেরা, প্রশান্ত সামন্ত, নীলমনি মুখার্জী, তাপস পোড়েল, আশিষ মাইতি, অরূপ ভট্টাচার্য, নিখিল অধিকারী, তুহিন কান্তি দাস,সমরেশ আদক,বিবেকানন্দ রায়,সুনীল চাবাড়ী,অরবিন্দ ভট্টাচার্য-সহ পরিবারের সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন নারায়ণ ভট্টাচার্যের সহধর্মিনী, পুত্র, কন্যা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও।

দীর্ঘদিন ধরে সমাজকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত নারায়ণ ভট্টাচার্য দাসপুর অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক সেবার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। গান্ধীবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দাসপুর গান্ধী মিশন, যা আজও এলাকার সামাজিক উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।তাঁর প্রয়াণে দাসপুর ও ঘাটাল মহকুমা জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, বিশিষ্টজন ও সাধারণ মানুষ একবাক্যে জানিয়েছেন— নারায়ণ ভাইয়ের মৃত্যুতে সমাজ হারাল এক আদর্শবান, দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান সমাজসংস্কারককে। বিশেষ করে বন্যা পরিস্থিতিতে ঘাটাল ও দাসপুরের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিক উদ্যোগ তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা আজও এলাকার মানুষের কাছে নতুন আশার আলো।

১৯৫১ সালে হুগলি জেলার বৈদ্যবাটিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা বিভূতিভূষণ ভট্টাচার্য ও মা হিন্দুবালাদেবী-র অষ্টম সন্তান ছিলেন নারায়ণ ভট্টাচার্য। ছোটবেলা থেকেই জীবনের সংগ্রাম তাঁকে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কলেজে পড়াকালীন ১৯৭৪ সালের উত্তাল নকশাল আন্দোলনের সময় তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণের সংঘর্ষ বাহিনী-তে যোগ দেন। সেই সময় থেকেই তাঁর সামাজিক কাজের জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়।১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যা তাঁর জীবনকে নতুন মোড় দেয়।

সারা বাংলা যখন জলবন্দি ও বিপর্যস্ত, তখন ‘গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন’-এর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তিনি ঘাটাল মহকুমায় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে পৌঁছন। ঘাটালের মানুষের অসহায়তা, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার ছবি তাঁর হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। সেই মুহূর্তেই তিনি স্থির করেন— এই মানুষের জন্যই তিনি কাজ করবেন, ঘাটালই হবে তাঁর কর্মভূমি।এই সময় তাঁর পরিচয় হয় ডিহিবলিহারপুরের কার্তিক পাড়ুইবৃন্দাবন মণ্ডল-এর সঙ্গে। কার্তিকবাবুর তত্ত্বাবধানে একটি পাটগুদামে থাকার ব্যবস্থা হয় তাঁর। পরে কার্তিকবাবুর দান করা জমিতে অস্থায়ী বাসস্থান গড়ে তোলেন নারাণভাই। সেখানেই তাঁদের সহযোগিতায় এবং ডিআরডিএ ফাউন্ডেশন-এর সহায়তায় গড়ে ওঠে ‘সার্বিক গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র’— যার মূল লক্ষ্য ছিল অসহায় ছেলে-মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলা।

এই উদ্যোগ বহু তরুণ-তরুণীর জীবন বদলে দেয়।এরপর ১৯৮৫ সালে নবাব খাঁ-এর কাছ থেকে চার বছরের কিস্তিতে প্রায় দুই একর জমি মাত্র ১৫ হাজার টাকায় কিনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গান্ধী মিশন ট্রাস্ট’। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, ছিল তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও সমাজগঠনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ।এই সময় তাঁর জীবনে আসেন দাসপুরের খাটবাড়ই গ্রামের শিল্পপতি সৈয়দ সাব্বির আহমেদ, যিনি পরবর্তীতে তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন। এনজিওর কাজের সূত্রে পরিচয় হয় ভুবনেশ্বরের সৌমিত্রী পট্টনায়ক-এর সঙ্গে।

নারাণভাইয়ের কাজ ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সৌমিত্রীদেবী দাসপুরে চলে আসেন এবং ১৯৮৬ সালে তাঁকে বিয়ে করে ট্রাস্টের কাজে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ছিলেন নারাণভাইয়ের প্রকৃত ছায়াসঙ্গী।১৯৮৭ সালে তাঁর উদ্যোগে ‘এল.সি. দানি আই হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাত্র সাত জন সদস্যকে নিয়ে শুরু হওয়া এই হাসপাতাল গরিব ও দুঃস্থ মানুষের জন্য বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনের ব্যবস্থা করত। নারাণভাইয়ের বিশ্বাস ছিল,“সমাজসেবা প্রচার নয়, সমাজসেবা উপস্থিতি।”গান্ধী মতাদর্শকে সামনে রেখে তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় ৪০টি দেশ ভ্রমণ করেন।

সেখান থেকে সংগৃহীত অনুদান ব্যয় করেন ঘাটালের মানুষের কল্যাণে। ২০০৪ সালে ঘাটালে রেড ক্রস সোসাইটি-র ভবন তৈরি হলে তাঁর অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং সমাজসেবার মানসিকতার জন্য তাঁকে সম্পাদক করা হয়।

তাঁর হাত ধরে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।শুধু সমাজসেবক নন, তিনি ছিলেন খাদ্যরসিক, সাহিত্যপ্রেমী ও রসবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। মানুষের বিপদে সমস্যার সমাধানে সবসময় এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই তাঁকে ‘ভাই’ করে তুলেছিল সবার কাছে।শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর অবদান দাসপুরবাসীর মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। নারায়ণ ভাই শুধু একজন সমাজসেবক নন, তিনি ছিলেন এক চলমান প্রতিষ্ঠান, যার আদর্শ আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে।

Latest