পশ্চিম মেদিনীপুর সেখ ওয়ারেশ আলী : পশ্চিম মেদিনীপুরে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এস আই আর) পর্বে যখন ভোটার তালিকা সংক্রান্ত শুনানি চলছে, ঠিক সেই সময়েই মেদিনীপুর পৌরসভার একটি বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। পৌরসভার তরফে প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এস আই আর শুনানির জন্য প্রয়োজন পড়লে রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট মিলবে মেদিনীপুর পৌরসভা থেকে। এমনকি অফিস টাইমের বাইরেও বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত পৌরপ্রধানের ব্যক্তিগত অফিস থেকেও এই সার্টিফিকেট দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে প্রশাসনিক স্তর পর্যন্ত জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির জেরে রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে ভিড় জমছে মেদিনীপুর পৌরসভায়।

বিশেষ করে যাঁরা এস আই আর শুনানির নোটিস পেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই সকাল থেকে পৌরসভা চত্বরে অপেক্ষা করছেন প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের আশায়।নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইনে কী বলা আছে? নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এস আই আর শুনানির জন্য মোট ১১ দফা নথির তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই তালিকার ৬ নম্বর দফায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—রাজ্যের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র’ জমা দিতে হবে। অর্থাৎ, শুনানিতে যে রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য, তা হতে হবে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী,এই পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা রয়েছে মহকুমা শাসকের হাতে। সাধারণ মানুষকে এই সার্টিফিকেট পেতে গেলে মহকুমা শাসকের দপ্তরে একাধিক নথি জমা দিতে হয়। সেই নথিগুলির মধ্যেই একটি হলো পৌরসভার দেওয়া সাধারণ রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট।ভেরিফিকেশন ছাড়া স্থায়ী সার্টিফিকেট নয়।নথি জমা পড়ার পর আবেদনকারীর তথ্য পাঠানো হয় ডিআইবি (ডিস্ট্রিক্ট ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ) ভেরিফিকেশনের জন্য। ভেরিফিকেশন রিপোর্টে যদি দেখা যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্তত ১৫ বছর ধরে ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, তবেই তাঁকে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগে পৌরসভার দেওয়া কোনও রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেটকেই স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র হিসেবে গণ্য করা যায় না—এমনটাই প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য। এই বিতর্কের মধ্যেই মেদিনীপুরের ইআরও তথা মহকুমা শাসক মধুমিতা মুখার্জী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন,এস আই আর শুনানির ক্ষেত্রে পৌরসভার দেওয়া রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট গ্রহণ যোগ্য নয়।

এই মন্তব্য সামনে আসতেই পৌরসভার বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।বিজেপির অভিযোগ, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই পৌরসভার তরফে এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের দাবি, এতে প্রকৃত ভোটারদের সমস্যায় পড়তে হবে এবং ভুয়ো ভোটারদের সুবিধা হতে পারে। বিজেপির আরও বক্তব্য, পৌরসভার দেওয়া সার্টিফিকেট নিয়ে এস আই আর শুনানিতে গেলে তা গ্রাহ্য না হওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাড়তি ভোগান্তির শিকার হতে হবে। এই গোটা বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই জেলাশাসক ও নির্বাচন কমিশনের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে বিজেপি।

মেদিনীপুর পৌরসভার পৌরপ্রধানের দাবি, মানুষের সুবিধার কথা ভেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পৌরসভার দেওয়া এই রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট নির্বাচন কমিশনের এস আই আর সংক্রান্ত কাজে সহায়ক হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। পৌরসভার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই মেদিনীপুর পৌরসভায় রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে মানুষের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। এস আই আর শুনানির ডাক পাওয়া বহু ভোটার সকাল থেকে পৌরসভা চত্বরে অপেক্ষা করলেও, শেষ পর্যন্ত এই নথি শুনানিতে আদৌ কাজে লাগবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। যদি শেষ পর্যন্ত পৌরসভার দেওয়া রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট নির্বাচন কমিশনের এস আই আর শুনানিতে গ্রহণ যোগ্য না হয়, তাহলে সাধারণ ভোটারদের ভোগান্তি যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।