৩০০ বছরের ঐতিহ্যে আজও কালী রূপে পূজিতা দুর্গাপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মেয়ে!

৩০০ বছরের ঐতিহ্যে আজও কালী রূপে পূজিতা দুর্গাপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মেয়ে!

পুকুরের কালো জলে তলিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ির মেয়ে। সারা রাত ধরে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। কিন্তু পরদিন ভোরে, লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মাথায় জলপূর্ণ কলস নিয়ে পুকুর থেকে উঠে এসেছিলেন সেই মেয়েই। তারপর তাঁর নির্দেশেই শুরু হয়েছিল কালীপুজো। প্রায় ৩০০ বছর ধরে দুর্গাপুরের আমড়াই গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে কালী রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিহাস, পারিবারিক জনশ্রুতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবন্ধনে এই পুজো আজও বহন করে চলেছে এক রহস্যময় ঐতিহ্য।

কুলীন প্রথার শিকার কল্যাণীর আশ্রয় হয়েছিল দাদার বাড়িতে : দুর্গাপুরের আমড়াই গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কালীপুজোর ইতিহাস জানতে গেলে ফিরে যেতে হয় কয়েক শতাব্দী আগে। পারিবারিক জনশ্রুতি অনুযায়ী, বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আদি নিবাস ছিল কাটোয়া অঞ্চলের বন্দ্যঘটি এলাকায়। সেখান থেকে পরিবারের এক সদস্য কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্গাপুরের কাছে আমড়াই গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। পরিবারের আর এক পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।কৃষ্ণমোহনের বোন কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ছিল তৎকালীন সমাজব্যবস্থার নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। পারিবারিক জনশ্রুতি অনুযায়ী, কুলীন প্রথার কারণে স্বামীর দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার পর তিনি দাদার কাছে আমড়াই গ্রামে চলে আসেন। সেখানেই কাটছিল তাঁর দিন। কিন্তু কে জানত, এই কল্যাণীকে ঘিরেই একদিন জন্ম নেবে এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ঐতিহ্য, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকবে।

তামলা পুকুরে তলিয়ে যাওয়া, তারপর অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের কাহিনি : আমড়াই গ্রামের উত্তর দিকে রয়েছে তামলা পুকুর। কথিত আছে, একদিন পাড়ার কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে ওই পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিলেন কল্যাণী। স্নান করার সময় এক বান্ধবীর পায়ে জলের মধ্যে কোনও কিছুর স্পর্শ লাগে। ভয় পেয়ে তিনি জল থেকে উঠে এসে কল্যাণীকে বিষয়টি জানান।সাহসী কল্যাণী নিজেই সেই রহস্যের সন্ধানে পুকুরের জলে নামেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আচমকা তলিয়ে যান তিনি। বান্ধবীর চোখের সামনেই যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি তাঁকে গভীর জলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।কল্যাণীর নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে ছুটে আসেন পরিবারের সদস্যরা। শুরু হয় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি। স্থানীয় ধীবরদের ডেকে পুকুরে জাল ফেলা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৩০টি ধীবর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালিয়েও কল্যাণীর সন্ধান পাননি। এমনকী পুকুরের জল বের করে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল বলে কথিত রয়েছে। কিন্তু রাত গভীর হওয়ায় সেই চেষ্টা থেমে যায়।বোনকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন কৃষ্ণমোহন। কীভাবে কল্যাণী নিখোঁজ হলেন, কোথায় গেলেন তিনি—কোনও প্রশ্নেরই উত্তর মিলছিল না। পরিবারের সদস্যদের কাছে সেই রাত ছিল উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তায় ভরা।

স্বপ্নাদেশে মিলল নতুন আশার বার্তা : পারিবারিক জনশ্রুতি অনুযায়ী, সেই রাতের শেষ প্রহরে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় স্বপ্নে মা কালীর দর্শন পান। স্বপ্নে তাঁকে জানানো হয়, কল্যাণী ভালো আছেন এবং পরদিন সূর্যোদয়ের সময় ফিরে আসবেন। একই সঙ্গে বাড়িতে কালীপুজোর ব্যবস্থা করার নির্দেশও দেওয়া হয়।শুধু কৃষ্ণমোহন নন, গ্রামের ঢাকি বেণী বাদ্যকরও নাকি একই রাতে স্বপ্নাদেশ পান। তাঁকে সূর্যোদয়ের সময় পুকুরঘাটে গিয়ে ঢাক বাজিয়ে দেবীর আরাধনা করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রচলিত রয়েছে।এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরদিন ভোরে তামলা পুকুরের ঘাটে জড়ো হন গ্রামের বহু মানুষ। সকলের চোখ তখন পুকুরের দিকে। কখন কী ঘটে, সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন উপস্থিত মানুষজন।জনশ্রুতি বলে, সূর্যোদয়ের সময় পুকুরের জল থেকে উঠে আসেন কল্যাণী। তাঁর মাথায় ছিল একটি জলপূর্ণ কলস। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি ও মহিলাদের উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।তবে ফিরে আসা কল্যাণী যেন আগের সেই মানুষটি ছিলেন না। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তিনি কারও সঙ্গে কথা না বলে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যান। এরপর বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বাড়ির ঈশান কোণে কলসটি স্থাপন করে কালীপুজোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন বলে কথিত রয়েছে। সেই ঘটনাকেই এই পরিবারের কালীপুজোর সূচনাপর্ব হিসেবে মানা হয়।

প্রাচীন ব্রহ্মকলস ঘিরে আজও অটুট বিশ্বাস : কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন ব্রহ্মকলস। পরিবারের বিশ্বাস, কল্যাণীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই জলপূর্ণ কলস আজও মন্দিরে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। কলসটিকে ঘিরে রয়েছে নানা ধর্মীয় রীতিনীতি ও পারিবারিক পরম্পরা।কথিত আছে, বছরে একবার কলসের জল পরিবর্তন করা হয়। সোনা, রুপো, তামা, কাঁসা ও পিতলের মতো বিভিন্ন ধাতু দিয়ে তৈরি পদ্মচিহ্নিত শ্রীযন্ত্র দিয়ে কলসটি ঢেকে রাখা হয়। কালীপুজোর রাতে তন্ত্রমতে দেবীর আরাধনা করা হয়।ভক্তদের বিশ্বাস, কল্যাণী কালীর কাছে মনস্কামনা জানালে তা পূরণ হয়। অনেকে মন্দিরের পাশের জলাশয়ে স্নান করেন এবং দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। কলসের জলকেও ঘিরে রয়েছে ভক্তদের নানা বিশ্বাস। তবে এসবই স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও পারিবারিক পরম্পরার অংশ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে পুজো : সময়ের সঙ্গে বদলেছে আমড়াই গ্রামের চেহারা। একসময়ের গ্রামীণ জনপদ এখন অনেকটাই আধুনিক। মন্দির পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে পাকা রাস্তা। কিন্তু বদলায়নি বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কালীপুজোর ঐতিহ্য।আসন্ন কালীপুজোকে ঘিরে মন্দির চত্বরে যখন প্রস্তুতি তুঙ্গে, তখন প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে পুজোর নানা আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত পরিবারের সদস্যরা। মন্দিরে গিয়ে পরিবারের প্রতিষ্ঠাতার নবম প্রজন্মের উত্তরপুরুষ সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কীভাবে এই পুজোর পরম্পরা আজও বহমান।মন্দিরের পুজোর বেদি এবং তার পিছনের দেওয়ালে থাকা চালচিত্রেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কল্যাণীকে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক কাহিনি। সেই চিত্র যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা পারিবারিক স্মৃতি ও বিশ্বাসের এক দৃশ্যমান দলিল।কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় থেকে শুরু হওয়া এই পুজো আজও তাঁর উত্তরপুরুষেরা ভক্তিভরে পালন করে আসছেন। প্রায় ৩০০ বছরের এই ঐতিহ্য কেবল একটি পারিবারিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আমড়াই গ্রামের সাংস্কৃতিক ও লোকবিশ্বাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুকুরে তলিয়ে যাওয়া এবং পরদিন ফিরে আসার কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও, স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে তার গুরুত্ব আজও অটুট। ইতিহাসের নথি, পারিবারিক স্মৃতি এবং লোককথার মেলবন্ধনে দুর্গাপুরের আমড়াই গ্রামের কল্যাণী কালীপুজো তাই আজও মানুষের কৌতূহল ও ভক্তির অন্যতম কেন্দ্র।

\\\\\\\\n\\\\\\\\n\\\\\\\\n\\\\n\\\\n\\n\\n\n\n