ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে নক্ষত্রপতন! ৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর!
সেখ ওয়ারেশ আলী : ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। প্রয়াত বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর প্রয়াণে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হল।হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা দীর্ঘক্ষণ কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দিয়েও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। সকাল ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে অসংখ্য অনুরাগীর মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।

অভিনয়ের স্বতন্ত্র ঘরানা, সংলাপে অনন্য ছাপ : ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। তাঁর আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। মঞ্চাভিনয়ের মধ্য দিয়ে শিল্পজগতে পথচলা শুরু করে পরবর্তী সময়ে হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন নানা।তাঁর অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তীব্র অভিব্যক্তি, শক্তিশালী সংলাপ পরিবেশন এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা। ‘অঙ্কুশ’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’ ও ‘রাজনীতি’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে উদয় শেট্টির চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করেছিল, গম্ভীর ও অ্যাকশনধর্মী চরিত্রের পাশাপাশি হাস্যরসাত্মক ভূমিকাতেও তিনি সমান সাবলীল। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-সহ একাধিক সম্মান পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার কাজেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন নানা পাটেকর।

পর্দার বাইরেও সমাজসেবায় অবদান : নানা পাটেকরের পরিচয় শুধু একজন সফল অভিনেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজসেবামূলক কাজেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মহারাষ্ট্রের কৃষক ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি জল সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে কৃষক পরিবারের সহায়তা ও জল সংরক্ষণে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। পর্দায় কখনও প্রতিবাদী, কখনও কঠোর, আবার কখনও হাস্যরসাত্মক চরিত্রে দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি।

শোকস্তব্ধ চলচ্চিত্র মহল : নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়করি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে অভিনেতার সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তাঁর অভিনয়প্রতিভা ও স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এক দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা পাটেকর বারবার প্রমাণ করেছেন, অভিনয়ের শক্তি শুধু তারকাখ্যাতিতে নয়, বরং চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতায়। তাঁর কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় উপস্থিতি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে। একজন শিল্পীর প্রয়াণে থেমে যায় তাঁর জীবনের পথচলা, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ও শিল্পকর্ম বেঁচে থাকে দর্শকদের স্মৃতিতে। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। তাঁর অভিনীত অসংখ্য চরিত্রের মধ্য দিয়েই আগামী প্রজন্মের দর্শকদের কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

নানা পাটেকরের প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এক যুগের অবসান। তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি শ্রদ্ধা, অনুরাগীদের হৃদয়ে তাঁর স্মৃতি অমলিন।