একশো বছরের পথচলা, প্রজন্মের পর প্রজন্মের সঙ্গী—আকাশবাণী কলকাতা!

একশো বছরের পথচলা, প্রজন্মের পর প্রজন্মের সঙ্গী—আকাশবাণী কলকাতা!

নিজস্ব সংবাদদাতা : ১৯২৭ সালের ২৬ আগস্ট বোম্বাইয়ের পর ভারতের দ্বিতীয় বেতার কেন্দ্র হিসেবে কলকাতায় শুরু হয় বেতার সম্প্রচার। প্রথমদিকে ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি’ (IBC)-র অধীনে ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের একটি ভাড়া বাড়ি থেকেই শুরু হয়েছিল কলকাতা বেতার কেন্দ্রের পথচলা। সময়ের সঙ্গে সেই কেন্দ্রই পরিণত হয় ‘আকাশবাণী কলকাতা’-য়।প্রতিষ্ঠার একশো বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আকাশবাণী কলকাতা আজ শুধুমাত্র একটি সম্প্রচার কেন্দ্র নয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের যোগাযোগ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। দীর্ঘ এই পথচলায় বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে আকাশবাণী কলকাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে।বাঙালির ঘরে ঘরে রেডিও পৌঁছে যাওয়া ছিল একসময় কার্যত বৈপ্লবিক ঘটনা। মারকনির বেতার প্রযুক্তিকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন একদল প্রতিভাবান শিল্পী ও স্রষ্টা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজকুমার মল্লিক, বাণীকুমার, রায়চাঁদ বড়াল-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সৃষ্টিশীলতায় বেতার শুধুমাত্র সংবাদ বা বিনোদনের মাধ্যম থাকেনি, হয়ে উঠেছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।১৯৩১ সালে সূচনা হয় কালজয়ী অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরসৃষ্টিতে মহালয়ার ভোরে যে আবহ তৈরি হয়, তা আজও বাঙালির শারদোৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অনুষ্ঠান শ্রোতাদের মনে একইরকম আবেগ ও নস্টালজিয়া তৈরি করে চলেছে।আকাশবাণী কলকাতার অবদান অবশ্য সংগীত ও বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা সাহিত্য, নাটক এবং বৌদ্ধিক চর্চার প্রসারেও এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও কলকাতা বেতারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ‘আকাশবাণী’ নামটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নামও ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পরবর্তীকালে এই নামই সর্বভারতীয় বেতার সম্প্রচারের পরিচিতি হয়ে ওঠে।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র-সহ বাংলা সাহিত্যের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠানমালা। বিশেষ করে বেতার নাটক বাংলা শ্রোতাদের সামনে নাট্যচর্চার এক নতুন জগৎ খুলে দেয়।

বিভিন্ন নাটক, শ্রুতিনাটক ও সাহিত্যভিত্তিক অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছে।শিশু-কিশোরদের জন্য ‘শিশুমহল’ এবং ‘গল্পদাদুর আসর’-এর মতো অনুষ্ঠানও তৈরি করেছিল এক স্বতন্ত্র কল্পলোক। রেডিওর সামনে বসে গল্প, গান ও নাটক শোনার সেই অভিজ্ঞতা বহু প্রজন্মের শৈশবস্মৃতির সঙ্গে মিশে রয়েছে।একশো বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে সম্প্রচারের মাধ্যম ও শ্রোতাদের অভ্যাস। কিন্তু বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির সঙ্গে আকাশবাণী কলকাতার যে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখনও অমলিন। শতবর্ষে পা রেখে তাই আকাশবাণী কলকাতা শুধুমাত্র একটি বেতার কেন্দ্রের ইতিহাস নয়—এটি বাঙালির একশো বছরের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যেরও এক জীবন্ত দলিল।