শালবনের বুক চিরে স্কুলে ছুটে চলা শিক্ষক পেলেন রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান, ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’-এ ভূষিত ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া!
নিজস্ব সংবাদদাতা : কালো পিচের রাস্তা। দু’ধারে সাদা রঙের মার্কিং, ফুটপাতে লাল মোরামের আস্তরণ। সেই রাস্তা পেরিয়ে ঘন সবুজ শালবনের বুক চিরে এগিয়ে গেলে দেখা মেলে এক প্রত্যন্ত জনপদের। জঙ্গলমহলের সেই পরিবেশেই দাঁড়িয়ে মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠ। আর প্রতিদিন সেই শালবন ঘেরা রাস্তা ধরে বাইকে চেপে বিদ্যালয়ে পৌঁছে যান যিনি, তিনি আর কেউ নন—বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া।শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধুই চাকরি নয়, এক গভীর দায়বদ্ধতা। শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সমাজকল্যাণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর নিরন্তর কাজ তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। সেই দীর্ঘ পরিশ্রম ও নিষ্ঠারই স্বীকৃতি হিসেবে আসন্ন শিক্ষক দিবসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে তিনি পেতে চলেছেন ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’।১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল জন্ম ড. প্রসূন কুমার পড়িয়ার। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পর বি.এড এবং পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরু পূর্ব মেদিনীপুরের কৃষ্ণগঞ্জ কৃষি শিল্প বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠে।

পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে সাফল্য
তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি শুধু পঠনপাঠনের ক্ষেত্রেই নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। জেলা ও রাজ্যস্তরে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। জাতীয় পর্যায়ে ছাত্র প্রদীপ মান্ডির অংশগ্রহণ এবং সুব্রত কাপ ফুটবলে জেলা পর্যায়ে রানার্স আপ হওয়া বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে অন্যতম। কলা উৎসবেও রাজ্যস্তরে বিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।একইসঙ্গে কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও পরিচিত ড. পড়িয়া। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন ছাত্রবান্ধব শিক্ষক ও দায়িত্বশীল প্রধান শিক্ষক।বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে শুরু করে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় মানুষের অভিযোগ ও সমস্যার সমাধান, কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পড়ুয়াদের নিয়মিত অনুপ্রাণিত করা—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে আসছেন তিনি।

শুধু স্কুল নয়, গোটা এলাকার শিক্ষার দায়িত্ব
মৌপালকে ঘিরে রয়েছে চ্যাংশোল, নতুনডিহি, নোনাশোল, জলহরি, ভুরসার মতো একাধিক জঙ্গলঘেরা গ্রাম। এখনও এই সব এলাকায় শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। স্কুলছুটের সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের উদ্যোগে স্কুলছুট পড়ুয়াদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচিও চালানো হচ্ছে।বিদ্যালয়ের সহযোগিতায় স্কুল ক্যাম্পাসে মঞ্চস্থ হয়েছে ‘তিনটি মেয়ের গল্প’ নাটক। উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের শিক্ষা, খেলাধুলা এবং অধিকার সম্পর্কে পরিবার ও সমাজকে সচেতন করা।ড. প্রসূন কুমার পড়িয়ার বক্তব্য, জঙ্গলমহলের বহু এলাকায় এখনও মেয়েদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সেই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতেই বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সচেতনতা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।বিদ্যালয়ের ছাত্রী বাসন্তী টুডুর বিয়ে রুখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। পরবর্তীতে তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপকে সম্মানিত করেছিলেন তৎকালীন জেলাশাসক খুরশিদ আলী কাদেরী।
বিদ্যালয়েই গড়ে উঠেছে প্রজাপতির ঠিকানা
ড. পড়িয়ার উদ্যোগে মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠে গড়ে উঠেছে অভিনব ‘প্রজাপতি সংরক্ষণ স্থল’। পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ বিদ্যালয়ের পরিবেশবান্ধব ভাবনার অন্যতম নজির।বিদ্যালয়ের ফলের বাগানে রয়েছে আম, পেয়ারা, আপেল, আঙুর, কমলালেবু-সহ বিভিন্ন ফলের গাছ। ফুলের বাগানে গাঁদা, কেতকি, চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া, পিটুনিয়া ও গোলাপের সমাহার।পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ভেষজ বাগান। সেখানে রয়েছে কালমেঘ, হরিতকী, আমলকি, তুলসী, নিম, পুদিনা, আয়াপান, থানকুনি, ধুতুরা ও ব্রাহ্মী-সহ বিভিন্ন ঔষধি গাছ। সবজির বাগানে রয়েছে কুমড়ো, বেগুন, পেঁপে, ঢেঁড়স-সহ নানা সবজি।ফুল-পাতায় ঘেরা এই পরিবেশে রঙবেরঙের প্রজাপতির আনাগোনা পড়ুয়াদের কাছে হয়ে উঠেছে প্রকৃতিকে কাছ থেকে চেনার এক জীবন্ত পাঠশালা।
আধুনিক পরিকাঠামোয় বদলে যাচ্ছে বিদ্যালয়ের চেহারা
ড. প্রসূন কুমার পড়িয়ার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক আধুনিক পরিকাঠামো। রয়েছে হস্টেল বিল্ডিং, মিনি ইনডোর গেমস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন কমপ্লেক্স, বাউন্ডারি ওয়াল, ছাত্রবান্ধব রঙিন শ্রেণিকক্ষ, স্মার্ট ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাবরেটরি, ফুল-ফল-সবজি ও ভেষজ উদ্যান, ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং স্পোর্টস ও কালচারাল ট্রেনিং ইউনিট।ফলে প্রত্যন্ত জঙ্গলমহলের এই বিদ্যালয় ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে একটি আদর্শ শিক্ষাবান্ধব প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ।
একের পর এক সম্মান, এবার রাজ্যের সেরা স্বীকৃতি
শিক্ষক হিসেবে এর আগেও একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন ড. প্রসূন কুমার পড়িয়া। পেয়েছেন ‘বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড’, ‘আচার্যরত্ন সম্মান’, ‘শিক্ষকজ্যোতি সম্মান’ এবং ‘গুরু সম্মান’। কবি ও সাহিত্যিক হিসেবেও পেয়েছেন ‘রূপসী বাংলা পুরস্কার’ এবং ‘জঙ্গলমহল উদ্যোগ সম্মাননা’।তাঁর নেতৃত্বে মৌপাল দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠও পেয়েছে নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার, শিশুমিত্র পুরস্কার, সেরার সেরা বিদ্যালয় পুরস্কার-সহ রাজ্য ও জাতীয় স্তরের একাধিক স্বীকৃতি।তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো অন্য কিছু—ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, সহকর্মী এবং শিক্ষা আধিকারিকদের আস্থা ও ভালোবাসা।আর সেই দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি হিসেবেই এবার তাঁর মুকুটে যুক্ত হতে চলেছে আরও এক সম্মান—‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’।জঙ্গলমহলের এক প্রত্যন্ত বিদ্যালয় থেকে রাজ্যস্তরের এই স্বীকৃতি শুধু ড. প্রসূন কুমার পড়িয়ার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি প্রত্যন্ত বাংলায় নীরবে কাজ করে চলা অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার পরিশ্রম ও দায়বদ্ধতারও স্বীকৃতি।শালবনের পথ ধরে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া সেই শিক্ষকই আজ হয়ে উঠেছেন জঙ্গলমহলের শিক্ষার এক অনুপ্রেরণার নাম।