বিএডের বেহাল দশা! শিক্ষক তৈরির কারখানা বাঁচাতে এবার কি এগিয়ে আসবেন জগন্নাথ?

বিএডের বেহাল দশা! শিক্ষক তৈরির কারখানা বাঁচাতে এবার কি এগিয়ে আসবেন জগন্নাথ?

পশ্চিমবঙ্গের বিএড কলেজগুলিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সরকারি পরিদর্শনের পর যে তথ্যগুলি প্রকাশ্যে এসেছে, আমার কাছে সেটি শুধুমাত্র কয়েকশো কলেজের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের গল্প নয়; এর ভিতরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন। যে প্রতিষ্ঠানগুলির কাজ ভবিষ্যতের শিক্ষক তৈরি করা, সেখানে যদি শিক্ষার পরিবেশই অনুপস্থিত থাকে, তাহলে আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে কেমন শিক্ষক তুলে দিচ্ছি? জুলাই ও আগস্ট মাস জুড়ে রাজ্যের ৬০২টি বিএড কলেজে পরিদর্শনের পর উচ্চশিক্ষা দপ্তর যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বহু প্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামো, শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থী, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর ঘাটতি পাওয়া গেছে। প্রায় ৪৫০টি কলেজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অকার্যকর বা নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার কথাও বলা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে কলেজের অস্তিত্ব না পাওয়া, কোথাও তালা ঝুলতে দেখা, আবার কোথাও অন্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চলার মতো অভিযোগও সামনে এসেছে। সরকারি মূল্যায়নে ১১৪টি কলেজ ৩০ শতাংশের নিচে নম্বর পেয়েছে এবং ১২১টি প্রতিষ্ঠানকে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ১৫১টি কলেজ নির্দিষ্ট মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ফল করেছে।পরিসংখ্যানগুলি তাই শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যা যেন একটি করে প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমেই যে কথাটি মনে আসে, তা হল—এতদিন কীভাবে চলছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলি?

একটি কলেজ এক সকালে উঠে অযোগ্য হয়ে যায় না। শিক্ষক নেই, পরিকাঠামো নেই, নিয়মিত শিক্ষার পরিবেশ নেই, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে নির্ধারিত ঠিকানায় প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন ধরে থেকে থাকে, তাহলে এতদিনের নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আজকের প্রশাসনিক অভিযানকে স্বাগত জানিয়েও তাই গত দিনের প্রশাসনিক নীরবতার হিসাব চাওয়া জরুরি।উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তিনি শিক্ষক-প্রশিক্ষণের নামে ‘teaching shops’ চলতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলির বাস্তব পরিস্থিতি সামনে এসেছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। ২১ দিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে affiliation সংক্রান্ত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে মূল নীতিগত প্রশ্নে দ্বিমত করার অবকাশ কম। শিক্ষা কখনও নিছক পণ্য হতে পারে না। আর শিক্ষক-শিক্ষা তো আরও নয়। কারণ একটি সাধারণ পণ্যের মান খারাপ হলে ক্ষতি একজন ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু একজন অযোগ্য শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান, তখন তাঁর অযোগ্যতার প্রভাব পড়ে বহু শিক্ষার্থীর উপর। সেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, তাদের চিন্তাভাবনা, তাদের শেখার পদ্ধতি সবকিছুর উপর। তাই শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ‘চলছে’ বলে কোনও ব্যবস্থা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।

একটি B.Ed. সার্টিফিকেট একজন ব্যক্তিকে একটি যোগ্যতার স্বীকৃতি দিতে পারে; কিন্তু সার্টিফিকেট একা একজন মানুষকে শিক্ষক বানায় না। একজন শিক্ষক তৈরি হন পাঠ পরিকল্পনা করতে করতে, শিশুর মন বুঝতে শিখতে শিখতে, teaching practice-এর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে, শ্রেণিকক্ষে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং শিক্ষাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে। এই জায়গাতেই ‘ডিগ্রি বিক্রি’র অভিযোগটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। সরকারি বক্তব্যে এমন অভিযোগও সামনে এসেছে যে কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে ডিগ্রি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতিবেশী রাজ্যের একটি মুখ্যসচিবের চিঠির প্রসঙ্গও এই তদন্তের সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এখানে একটি সতর্কতার কথা বলতেই হয়। অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। নিরপেক্ষ তদন্ত, নথি যাচাই এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঠিক করতে হবে কোথায় সত্যিই অনিয়ম হয়েছে। অন্য রাজ্যের ছাত্র পশ্চিমবঙ্গে পড়তে আসছেনএটি কোনও অপরাধ নয়। কিন্তু কেউ যদি সত্যিই ক্লাস, ইন্টার্নশিপ কিংবা প্রয়োজনীয় একাডেমিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ডিগ্রি পেয়ে থাকেন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কারণ এখানে শুধু একজন ছাত্রের ডিগ্রির প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হল, সেই ডিগ্রি নিয়ে আগামী দিনে তিনি যখন একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়াবেন, তখন তাঁর হাতে কি থাকবে শুধু একটি সার্টিফিকেট, নাকি থাকবে একজন শিক্ষক হিসেবে দাঁড়ানোর প্রকৃত যোগ্যতা? এই প্রশ্নটি আমাদের ভাবতেই হবে। আর এখানেই আমি সরকারের বর্তমান উদ্যোগের সঙ্গে একটি বড় প্রত্যাশা জুড়ে দিতে চাই। অভিযান যেন শুধু ‘কতগুলি কলেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল’—এই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এর পরের প্রশ্ন হওয়া উচিত কীভাবে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার মানকে স্থায়ীভাবে উন্নত করব? NCTE-র শিক্ষক-শিক্ষা সংক্রান্ত কাঠামোতেও যোগ্য শিক্ষক, উপযুক্ত পরিকাঠামো, গ্রন্থাগার, instructional facilities এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নির্দিষ্ট মানদণ্ডের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করাও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। তাহলে সেই মানদণ্ড বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের মূল পরীক্ষা।

আমার মনে হয়, প্রত্যেকটি B.Ed. কলেজের জন্য একটি স্বচ্ছ public academic profile থাকা দরকার। কোন কলেজের affiliation বৈধ, কোন কলেজ NCTE-র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, কতজন পূর্ণকালীন শিক্ষক আছেন, পরিকাঠামো কেমন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কত, internship কীভাবে হচ্ছে, গত পরিদর্শনে কী ফল হয়েছে—এই মৌলিক তথ্যগুলি ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সামনে থাকা উচিত। ভর্তি হওয়ার আগে একজন শিক্ষার্থী যেন জানতে পারেন, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে নিজের দুই বছর এবং নিজের পরিবারের অর্থ বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন, সেটি আসলে কেমন। কারণ শিক্ষার্থীরাও এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশীদার।একজন ছাত্র বা ছাত্রী কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় সাধারণত ধরে নেন যে প্রতিষ্ঠানটি বৈধ, অনুমোদিত এবং নিয়ম মেনে চলছে। পরে যদি দেখা যায় কলেজের পরিকাঠামো বা affiliation নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তার পুরো দায়ভার সেই শিক্ষার্থীর উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কলেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে একই সঙ্গে সেখানে পড়া বৈধ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে। দোষীর শাস্তি হবে, কিন্তু নির্দোষের ভবিষ্যৎ যেন শাস্তি না পায়। এই ভারসাম্যটিই এখন সবচেয়ে জরুরি। আর একটি বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ভালো কলেজগুলিকে যেন এই সামগ্রিক সংকটের সঙ্গে এক করে দেখা না হয়। পরিদর্শনের তথ্যই বলছে, সব প্রতিষ্ঠান একই অবস্থায় নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করেছে। তাঁদের কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। কারণ শুদ্ধিকরণ মানে সবাইকে সন্দেহ করা নয়; বরং ভালো ও খারাপের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা।

আমরা প্রায়ই শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য মাপি কতজন পাশ করল, কতজন ডিগ্রি পেল, কতগুলি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এই সংখ্যাগুলি দিয়ে। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার ক্ষেত্রে আরও একটি প্রশ্ন থাকা উচিত কতজন সত্যিকারের শিক্ষক হয়ে উঠলেন? প্রতি বছর হাজার হাজার B.Ed. degree দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কতজন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একটি শিশুকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারবেন? কতজন পিছিয়ে থাকা ছাত্রটির হাত ধরে তাকে এগিয়ে নিতে পারবেন? কতজন শুধু বইয়ের উত্তর মুখস্থ না করিয়ে তাকে ভাবতে শেখাবেন? কতজন বুঝবেন যে শিক্ষার্থীর নম্বরের পাশাপাশি তার আত্মবিশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনও মার্কশিটে লেখা থাকে না। তাই আজকের এই বিতর্ককে আমি শুধু ‘বিএড কলেজের অনিয়ম’ হিসেবে দেখতে চাই না। এটি আমাদের কাছে শিক্ষকতার মর্যাদা নিয়ে ভাবারও একটি সুযোগ। শিক্ষক যদি জাতি গঠনের কারিগর হন, তাহলে সেই কারিগর তৈরির প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সর্বোচ্চ মানের হতে হবে। সরকার যদি সত্যিই এই পথে এগোতে চায়, তবে এই অভিযানকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে পরিণত করতে হবে। নিয়মিত surprise inspection, ডিজিটাল attendance যাচাই, শিক্ষক ও পরিকাঠামোর বাস্তব audit, internship-এর নজরদারি, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি—এসবকে একটি স্থায়ী ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। শুধু আজকের শো-কজ নয়, আগামী দিনের monitoring-ও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আজ ৪৫০টি কলেজকে নোটিশ দিয়ে আগামীকাল যদি আমরা আবার ভুলে যাই, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনও ‘shortcut’ নেই। একজন চিকিৎসককে যেমন প্রশিক্ষণ ছাড়া রোগীর হাতে তুলে দেওয়া যায় না, একজন শিক্ষককেও প্রশিক্ষণ ছাড়া একটি শ্রেণিকক্ষের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। কারণ শিশুর মন নিয়ে কাজ করার ভুলের ক্ষত অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই কারণেই উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর ‘teaching shop’ বন্ধ করার বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকলে চলবে না। সেটিকে বাস্তব প্রশাসনিক সংস্কারে পরিণত করতে হবে। এবং সেই সংস্কারের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত—স্বচ্ছতা।

কে ভালো, কে খারাপ তা তথ্য দিয়ে প্রমাণিত হোক। কে নিয়ম মেনেছে, কে মানেনি তা নথিতে থাকুক। কে সংশোধনের সুযোগ পাবে, আর কার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা হবে তারও স্পষ্ট কারণ থাকুক। তাহলেই এই অভিযান বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা B.Ed. কলেজের সংখ্যা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা ডিগ্রির সংখ্যা নিয়েও নয়। প্রশ্নটা হল আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে কেমন শিক্ষক তুলে দিতে চাই? কারণ একজন ভালো শিক্ষক হয়তো একশোটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারেন। আবার একজন অযোগ্য শিক্ষক সেই একশোটি জীবনের সম্ভাবনাকে পিছিয়ে দিতে পারেন। তাই এখন সময় এসেছে ডিগ্রির হিসাবের পাশাপাশি শিক্ষকের হিসাব করার। কলেজের ভবন কত বড়, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—সেখানে শিক্ষা কতটা গভীর। সার্টিফিকেট কতগুলি দেওয়া হল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন সেই সার্টিফিকেটের আড়ালে কতজন সত্যিকারের শিক্ষক তৈরি হলেন। শিক্ষক তৈরির কারখানা যদি শিক্ষকই তৈরি না করে, তবে সেই কারখানার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আর সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সময় হয়তো এবার সত্যিই শেষ। দেবরাজ সাহা ( লেখক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক)