Skip to content

‘চৌরঙ্গী’-র স্রষ্টা আর নেই: ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়!

1 min read

নিজস্ব সংবাদদাতা : সদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়ার ঝলমলে আলো-আঁধারি, তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মানুষের স্বপ্নভঙ্গ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার টানাপোড়েন—এই সবকিছুকে সাহিত্যের পাতায় অমর করে তুলেছিলেন যিনি, সেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় আর নেই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যজগতে নেমে এসেছে গভীর শোক।

উজ্জ্বল সূচনা, দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা :

১৯৫৫ সালে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ দিয়েই সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ। অল্প বয়সে লেখা ‘কত অজানারে’ তাঁকে পাঠকমহলে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। সেই সাফল্যই হয়ে ওঠে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যপথের ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে একের পর এক উপন্যাসে তিনি মধ্যবিত্ত সমাজ, শহুরে জীবন, ক্ষমতার করিডর ও মানুষের অন্তর্লোককে তুলে ধরেছেন নির্মোহ অথচ সংবেদনশীল ভাষায়।

চলচ্চিত্রে অমর সৃষ্টি :

শংকরের একাধিক উপন্যাস বড় পর্দায় সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’‘জন অরণ্য’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এছাড়া ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস থেকেও তৈরি হয় জনপ্রিয় সিনেমা, যেখানে স্যাটা বোসের ভূমিকায় অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তম কুমার। এক সাক্ষাৎকারে শংকর বলেছিলেন, “সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।”

জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘চৌরঙ্গী’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য মাইলফলক। ২০১২ সাল পর্যন্ত উপন্যাসটির ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে—যা এক বিরল কৃতিত্ব। অন্যদিকে ‘বোধোদয়’ প্রকাশের পর তিনি বিশেষ প্রশংসা পান। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন—“ব্রাইট, বোল্ড, বেপরোয়া।”

সংগ্রাম থেকেই সাহিত্য :

১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম শংকরের। পরে পরিবার নিয়ে চলে আসেন হাওড়ায়। স্বাধীনতার বছরেই পিতৃবিয়োগ—সেখান থেকেই শুরু কঠিন সংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে কেরানির কাজ থেকে গৃহপরিচারক, এমনকি হকারিও করেছেন তিনি। রিপন কলেজে পড়ার পাশাপাশি কাজ নেন কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের কাছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। বাস্তব জীবনের কঠোর পাঠই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে গভীরতা।

বিষয় ও ভঙ্গিতে বৈচিত্র্য :

শংকর কেবল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক নন, নিজস্ব লেখনভঙ্গিও বারবার বদলেছেন। ইতিহাস, সমাজবাস্তবতা থেকে আধ্যাত্মিকতা—সব ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী রচনাগুলি দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় ছিল।

২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি পান সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার। যদিও বহু সাহিত্যপ্রেমীর মতে, এই স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্যের তুলনায় অনেক দেরিতে এসেছে।

শোকপ্রকাশ :

তাঁর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর লেখায় যে গভীরতায় উঠে এসেছে, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-ও শোকজ্ঞাপন করে বলেন, বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র মানুষের জীবনকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন, তাঁর সৃষ্টি ভারতের সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

এক অনির্বচনীয় অজানার পথে:

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে পাঠকমনে জায়গা করে নেওয়া শংকর ছিলেন একান্ত বাঙালি জীবনানুভবের লেখক, অথচ তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বভারতীয় পরিসরে। আজ তাঁর প্রয়াণে নিঃশব্দ হয়ে এসেছে চৌরঙ্গীর আলো-ছায়া, অফিসকক্ষের নিঃসঙ্গতা আর মানুষের অন্তর্লোকের সেই অনুপম কথকতা। বাংলা সাহিত্য হারাল এক যুগান্তকারী গল্পকারকে।

Latest

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকারের গুরুত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা, উপস্থিত হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা উপাচার্য!