Skip to content

রুক্ষ লালমাটিতে সবুজের বিপ্লব: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গৌরসাধনবাবুর অরণ্য-সাধনা আজ অনুপ্রেরণা!

নিজস্ব সংবাদদাতা : ঝাড়গ্রামের কুলটিকরির লালমাটির প্রান্তর একসময় ছিল রুক্ষ, অনুর্বর আর প্রখর গ্রীষ্মে ফেটে যাওয়া এক কঠিন ভূখণ্ড। যেখানে ঘাসের কচি ডগাও সহজে মাথা তুলতে পারত না, সেই মাটিতেই আজ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক তরুণ অরণ্য। আর এই সবুজ বিপ্লবের নেপথ্যে রয়েছেন এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক— গৌরসাধন দাসচক্রবর্তী, যিনি স্থানীয়দের কাছে স্নেহ ও শ্রদ্ধার ‘গৌরবাবু’।দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের ইংরেজি শিখিয়েছেন, ব্যাকরণের নিয়ম বুঝিয়েছেন। কিন্তু অবসরের পর তিনি যেন জীবনের আরও বড় এক পাঠ শুরু করেন— প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পাঠ।

২০২১ সালে করোনার ভয়াবহ সময়, যখন চারপাশে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক, ঠিক তখনই তিনি লালমাটির উষর প্রান্তরে সবুজের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন।শাল, মহুয়া, বট, অশ্বত্থ, কাজু— এমন বহু গাছ তিনি নিজ হাতে রোপণ করেন। শুধু গাছ লাগিয়েই থেমে থাকেননি, সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দিনের পর দিন জল টেনে নিয়ে গিয়েছেন। কখনও ট্রলিতে বড় ড্রাম, কখনও বাড়ির বাতিল প্লাস্টিকের বোতলে জল ভরে তিনি ছুটে গিয়েছেন গাছগুলোর কাছে। নিজের পেনশনের টাকাও খরচ করেছেন এই কাজে। তাঁর বিশ্বাস, গাছ লাগানো যেমন উৎসব, তেমনই তাকে বাঁচিয়ে রাখা এক দীর্ঘ সাধনা।এই উদ্যোগের সবচেয়ে অনন্য দিক হলো শিশুদের নিয়ে তাঁর ভাবনা। গৌরবাবু ও তাঁর সহযাত্রীরা এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘সবুজের পাঠশালা’। এখানে পড়াশোনার জন্য কোনও ফি নেই। একমাত্র শর্ত— প্রতিদিন পড়তে আসার সময় প্রত্যেক শিশুকে সঙ্গে করে আনতে হবে একটি বোতল জল, যা ঢেলে দিতে হবে তৃষ্ণার্ত গাছের গোড়ায়।

এই অভিনব ভাবনা শুধু শিক্ষাই নয়, শিশুদের মনে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধও গড়ে তুলছে। তারা বইয়ের অক্ষরের পাশাপাশি মাটির গন্ধ চিনতে শিখছে, শিখছে পরিবেশ রক্ষার মূল্য।এক সময় একার লড়াই হিসেবে শুরু হলেও আজ গৌরবাবুর এই প্রয়াসে সামিল হয়েছেন তাঁর পরিবার, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীরা। সামাজিক মাধ্যমের তাঁর গোষ্ঠী ‘আমার ভাষা আমার গর্ব’-এর সদস্যরাও এই সবুজ আন্দোলনের অংশ হয়েছেন।আজ কুলটিকরির সেই পথ ধরে হাঁটলে আর আগের মতো রুক্ষতা চোখে পড়ে না। দেখা যায়, হাজার হাজার গাছের এক নবীন অরণ্য মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে দুলতে থাকা শাল-মহুয়ার পাতা যেন নীরবে কুর্নিশ জানায় সেই মানুষটিকে, যিনি অবসরের জীবনকে পরিণত করেছেন এক মহৎ অরণ্য-সাধনায়।গৌরসাধন দাসচক্রবর্তীর এই প্রয়াস প্রমাণ করে, এক জন মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ভালোবাসা চাইলে ধূসর প্রান্তরও একদিন সবুজ অভয়ারণ্যে বদলে যেতে পারে। তিনি শুধু গাছ লাগাননি, আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে গিয়েছেন এক সজীব উত্তরাধিকার এবং সুস্থ পৃথিবীর স্বপ্ন।

Latest