২৩.৮ কিমি উচ্চতায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওসোন্ড! NRSC-ISRO-র সহযোগিতায় বড় গবেষণা সাফল্য!

২৩.৮ কিমি উচ্চতায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওসোন্ড! NRSC-ISRO-র সহযোগিতায় বড় গবেষণা সাফল্য!

নিজস্ব সংবাদদাতা : বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণা এবং উপগ্রহ-তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় সাফল্য পেল বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ (CES)-এর উদ্যোগে এবং ISRO-র ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (NRSC)-এর সহযোগিতায় সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হল উন্নত GPS-Aided রেডিওসোন্ড পেলোড।রবিবার দুপুর ১টায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে এই উচ্চ-বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণা অভিযান পরিচালিত হয়। এটি ছিল এই ধরনের দ্বিতীয় সফল রেডিওসোন্ড উৎক্ষেপণ

২৩.৮১৯ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছাল রেডিওসোন্ড

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০ গ্রামেরও কম ওজনের সেন্সর ও টেলিমেট্রি ব্যবস্থা যুক্ত এই GPS রেডিওসোন্ডকে একটি প্রায় ৮০০ গ্রাম ওজনের ল্যাটেক্স আবহাওয়া বেলুনের মাধ্যমে আকাশে পাঠানো হয়।উড্ডয়নের পর বেলুনটি ট্রপোস্ফিয়ার অতিক্রম করে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছায়। সর্বোচ্চ ২৩.৮১৯ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে রেডিওসোন্ডটি প্রায় ৫৫ কিলোমিটার রৈখিক দূরত্ব অতিক্রম করে। পরে ঝাড়খণ্ডের পাথরা এলাকায় পেলোডটি অবতরণ করে।

কী কী তথ্য সংগ্রহ করেছে রেডিওসোন্ড?

উচ্চ বায়ুমণ্ডলে পৌঁছানোর পর রেডিওসোন্ডটি বিভিন্ন স্তরের বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বায়ুমণ্ডলীয় চাপ
  • বায়ুর তাপমাত্রা
  • আপেক্ষিক আর্দ্রতা
  • বায়ুপ্রবাহের গতি ও দিক
  • GPS-ভিত্তিক ত্রিমাত্রিক বায়ুপ্রবাহের তথ্য

দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল থার্মিস্টরের মাধ্যমে প্রায় ±০.২ কেলভিন নির্ভুলতায় বায়ুর তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়। হিউমিক্যাপ সেন্সরের মাধ্যমে নির্ণয় করা হয় আপেক্ষিক আর্দ্রতা।উড্ডয়নের সময় সংগৃহীত তথ্য ৪০১–৪০৩ মেগাহার্টজ রেডিও ব্যান্ডে ১২০০ বড গতিতে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল ওয়ার্কস্টেশনে পাঠানো হয়।

গবেষণার মূল লক্ষ্য কী?

এই গবেষণা অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল ISRO-র INSAT-3D এবং INSAT-3DR উপগ্রহের ১৯-চ্যানেল সাউন্ডার ডেটার নির্ভুলতা যাচাই করা।পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গে কালবৈশাখীর মতো তীব্র ঝড়ের আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বায়ুমণ্ডলের থার্মোডাইনামিক অস্থিরতা, উইন্ড শিয়ার এবং বিভিন্ন উচ্চতায় বায়ুর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করাও এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।এছাড়াও আঞ্চলিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল WRF/GFS-এর নির্ভুলতা বাড়াতেও সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করা হবে।

উপাচার্যের বার্তা

উৎক্ষেপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক দীপক কুমার কর। উচ্চ-উচ্চতার আবহাওয়া বেলুনের যাত্রার সূচনা করে তিনি জানান, এই সফল উৎক্ষেপণ উন্নত পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানচর্চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীকারকে তুলে ধরেছে।জাতীয় স্তরের সংস্থা NRSC-ISRO-র সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে আবহাওয়া গবেষণা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং উপগ্রহ ক্যালিব্রেশনের মতো জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলেও তিনি জানান।

গবেষণা দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

সমগ্র গবেষণা উদ্যোগটির পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং তত্ত্বাবধান করেন CES-এর অধিকর্তা ড. যতিশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়।গ্রাউন্ড স্টেশন ইন্টিগ্রেশন, সেন্সর ক্যালিব্রেশন, RF লিঙ্ক সিঙ্ক্রোনাইজেশন, প্রাক-উড্ডয়ন পরীক্ষা এবং বেলুন উৎক্ষেপণের বিভিন্ন ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সৌম্যকান্তি পান্ডা, অভীক সাহা, সুমন দাস, চিন্ময় খাঁড়া, শুভদীপ বর্মন, রালী হাঁসদা, শম্ভুনাথ জানা, দয়াল রানা, প্রতীক দে এবং উৎপল বাগ।তাঁদের তত্ত্বাবধানেই সম্পূর্ণ উড্ডয়ন প্রক্রিয়ার রিয়েল-টাইম টেলিমেট্রি তথ্য নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাণিজ্যকর দপ্তরের অতিরিক্ত কমিশনার অজন্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কার্তিক বেরা, রিমোট সেন্সিং ও GIS বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমৃত কামিল্যা, অনিমেষ মাজি-সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক, গবেষক ও কর্মীবৃন্দ।

নিরাপদে মাটিতে ফিরল পেলোড

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ২৩.৮১৯ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছানোর পর বেলুনটি নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ফেটে যায়। এরপর সংযুক্ত প্যারাসুটের সাহায্যে রেডিওসোন্ড পেলোডটি নিরাপদে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে।বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই রেডিওসোন্ড সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এতে কোনও ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা বিস্ফোরক উপাদান নেই।বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তর থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করে তা উপগ্রহ-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই উদ্যোগ পূর্ব ভারতের আবহাওয়া গবেষণা, তীব্র ঝড়ের পূর্বাভাস এবং আঞ্চলিক আবহাওয়া মডেলের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।